গোপাল সাহা:  "চাকরি পাইয়ে দেওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা নিত। টাকা দিলেই তবে চাকরির হত। আর চাকরি পাওয়ার পর তৃণমূলের মিছিলে মিটিংয়ে যেতে হত। সকালে বেরিয়ে যেত ব্যাঙ্কের কিছু কর্মীরা অ্যাটেনডেন্স দিয়ে, এরপর সন্ধ্যেবেলায় আবার সই করে বাড়ি চলে যেত। এভাবেই কাজ না করে বেশ কিছু কর্মীরা মাইনা পেয়ে যেত।" জানিয়েছেন পূর্বরেল কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কের কিছু কর্মী।

সুরেন্দ্রনাথ কলেজে টাকা, আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় নাম জড়ানোর পর এবার নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়লেন ‘কানকাটা দেবু’ নামে পরিচিত দেবাশিস ব্যানার্জি। সঙ্গে প্রকাশ্যে এসেছে কলেজেরই ছাদে বিলাসবহুল একাধিক ঘর স্মার্ট ক্লাসের নামে। আর এবার তাঁর বিরুদ্ধে এবার পূর্বরেল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কে টাকার বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়া, কর্মীদের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা এবং দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। 

ব্যাঙ্কের একাংশ কর্মীদের দাবি, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রায় ৪০-৪৫ জনকে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ, চাকরি পাওয়ার পর ওই কর্মীদের অনেককেই ব্যাঙ্কের নিয়মিত কাজ না করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে বলা হত। কর্মীদের কথায়, সকালে অফিসে এসে হাজিরা দিয়ে বেরিয়ে যেতেন অনেকে, পরে ব্যাঙ্ক বন্ধের সময় ফের এসে সই করে বাড়ি ফিরতেন। অথচ মাসের শেষে নিয়মিত বেতনও পেতেন। 

কর্মীদের আরও অভিযোগ, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী হয়েও অনেককে কলেজে দুর্নীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিল। কর্মীদের আরও অভিযোগ, ব্যাঙ্কে চাকরি করেও রাজনৈতিক কার্যকলাপে জোর করে যুক্ত করানো হত। কেউ আপত্তি করলে বা নির্দেশ না মানলে বদলির হুমকি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়াও গত ১৫ বছর ধরে ব্যাঙ্কের ভিতরে এক ধরনের ‘থ্রেট কালচার’ চলত বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মী।  

 তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলে যোগ না দিলে দূরবর্তী এলাকায় বদলি করে দেওয়ার ভয় দেখানো হতো। ফলে অনেকেই চুপ করে থাকতে বাধ্য হতেন। 

অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ব্যাঙ্কের বেশকিছু হলিডে হোম - পুরী দীঘা দার্জিলিং। এখানেও চলতো নানা অনিয়ম। কর্মীদের দাবি, ওই হলিডে হোমে কারা থাকবেন আর কারা থাকবেন না, সেই সিদ্ধান্ত নিতেন দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকি বিনামূল্যের হলিডে হোম, টাকার বিনিময়ে তার মনোনীত ব্যক্তিদের কিংবা রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের থাকার ব্যবস্থাও করা হতো বলে অভিযোগ। 

আরও অভিযোগ, ব্যাঙ্কের নির্বাচনেও প্রভাব খাটিয়ে কর্তৃত্ব বজায় রাখা হয়েছিল। বিরোধী প্রার্থী বা তাঁদের সমর্থকদের বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া এবং ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি একাংশের। 

কলেজ সূত্রে খবর, কলেজের প্রভাব খাটানোর এক বড় মাথা কানকাটা দেবু ওরফে দেবাশীষ ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ রাতুল ঘোষ। যিনি এই কোঅপারেটিভ ব্যাংকের কর্মী। যিনি কলেজের একাধিক দুর্নীতির কান্ডের সঙ্গে যুক্ত শুধু তাই নয়, বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াতে এবং ভোট পর্বে নিজের প্রভাব খাটিয়ে একাধিক অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়েছেন। যিনি নিজের নামে একাধিক ভোটার কার্ড বানিয়ে এ ধরনের অপরাধমূলক ভোটদানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। যার বাড়ি বাঁকুড়ায়, ব্যাংকে কাজের সূত্রে কলকাতায় থাকেন। 

উল্লেখ্য, সম্প্রতি সুরেন্দ্রনাথ কলেজে বিপুল পরিমাণ টাকা ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ দু’জনের বিরুদ্ধে মুচিপাড়া থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। সেই ঘটনার তদন্ত চলাকালীনই একের পর এক নতুন অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করেছে। কলেজের দুর্নীতির মাথা দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায় ও শিবাসিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৃণমূলের ছত্রছায়ায় যারা দীর্ঘদিন কাজ করে আসছিলেন তারা হলো সুকান্ত বাহাদুর, শুভজিৎ বর্মন, শুভজিৎ চক্রবর্তী। যাদের নামে ছাত্র-ছাত্রীরা সরাসরি অভিযোগ জানিয়েছে। যাদের আতঙ্কে কলেজে টেকা দায় বলেই অভিযোগ ছাত্রছাত্রীদের। 

 পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এই নিয়ে এখনও প্রশাসনের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি। তদন্তের অগ্রগতির দিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তাদের। পুলিশ জানিয়েছে তদন্ত চলছে তবে এখনো কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। খুব শীঘ্রই অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হবে।