আজকাল ওয়েবডেস্ক: শহর কলকাতায় এক চাঞ্চল্যকর ও রহস্যজনক ঘটনাকে কেন্দ্র করে দানা বেঁধেছে চরম উত্তেজনা। ছেলের বউয়ের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের কারণেই ছেলের মৃত্যু হয়েছে— এই মর্মান্তিক অভিযোগ তুলে এবার পুলিশের দ্বারস্থ হলেন এক অসহায় বাবা। ঘটনাটি ঘটেছে কলকাতার সিঁথি থানা এলাকায়। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ প্রশাসন। ইতিমধ্যেই ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে এবং মৃত্যুর আসল কারণ উদ্ঘাটন করতে তদন্তে নেমেছে পুলিশ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দল।
আজ ১১ জুন ২০২৬, দুপুর আনুমানিক ১২টা ৪০ মিনিট নাগাদ কলকাতার সিঁথি থানায় উপস্থিত হন উল্টোডাঙার গুরুদাস দত্ত গার্ডেন লেনের বাসিন্দা কমল কুমার চক্রবর্তী। থানায় এসে তিনি জানান, তাঁর ৪৩ বছর বয়সী ছেলে শুভাশিস চক্রবর্তী গত প্রায় সাত বছর ধরে তাঁর স্ত্রী দেবিকা সাহা (৪২)-র সঙ্গে সাত্রা পাড়া লেনে শ্বশুরবাড়িতেই বসবাস করছিলেন। কমলবাবুর অভিযোগ, আজই তিনি হঠাৎ তাঁর পুত্রবধূর কাছ থেকে জানতে পারেন যে শুভাশিস গতকালই মারা গিয়েছেন এবং গতকাল রাতেই তাঁর দেহ কলকাতার রতনবাবু ঘাটে দাহ করা হয়েছে। ঘটনার আকস্মিকতা এবং পরিবারের কাউকে না জানিয়ে তড়িঘড়ি শেষকৃত্য সম্পন্ন করার এই ঘটনায় তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কমলবাবু। তিনি সিঁথি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে দাবি করেছেন, তাঁর ছেলেকে চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে এবং এই ঘটনার পেছনে সম্পূর্ণ হাত রয়েছে পুত্রবধূ দেবিকা সাহার।
বাবার এই চাঞ্চল্যকর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে আজই সিঁথি থানায় একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। নবীন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১০৩(১) এবং ২৩৮(এ) ধারায় মামলাটি নথিভুক্ত করে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ।
প্রাথমিক পুলিশি তদন্তে নেমে শুভাশিসের জীবনযাত্রা ও বিগত কয়েকদিনের ঘটনার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। জানা গিয়েছে, মৃত শুভাশিস চক্রবর্তী পূর্বে নামী ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘সানোফি ফার্মা’-তে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং বেশ ভালোই বেতন পেতেন। কিন্তু ২০২১ সালে কোভিড পরিস্থিতির সময় আর পাঁচটা মানুষের মতোই তিনিও চাকরি হারান। চাকরি হারানোর পর থেকেই তিনি মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন বলে অনুমান। তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, শুভাশিস দীর্ঘদিন ধরে একটি জটিল স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং নিজেই নিয়মিত ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ সেবন করতেন। গত ১০-১৫ দিন ধরে তাঁর শারীরিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি হলেও তিনি কোনো পেশাদার চিকিৎসকের কাছে যাননি।
গত ৯ জুন ২০২৬ তারিখে শুভাশিসের শারীরিক অবস্থা চরম সংকটজনক হলে স্থানীয় এক চিকিৎসককে ডেকে পাঠানো হয়। ওই চিকিৎসক শুভাশিসকে পরীক্ষা করে জানান যে তাঁর রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছে। তিনি শুভাশিসকে স্যালাইন জল খাওয়ানোর পাশাপাশি অবিলম্বে কোনও হাসপাতালে ভর্তি করার কড়া পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিন, অর্থাৎ ১০ জুন সকালে খাবার খাওয়ার পর শুভাশিস ও তাঁর স্ত্রী দেবিকা নিজেদের ঘরে বিশ্রাম নিতে যান। দুপুরে দেবিকা সাহা তাঁর স্বামীকে ডাকতে গেলে কোনও সাড়া শব্দ না পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে আবারও সেই চিকিৎসককে খবর দেন। চিকিৎসক তড়িঘড়ি এসে পরীক্ষা করে শুভাশিস চক্রবর্তীকে মৃত বলে ঘোষণা করেন এবং একটি মৃত্যু শংসাপত্র (ডেথ সার্টিফিকেট) প্রদান করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার পরেই দেবিকা সাহা স্থানীয় একটি ওষুধের দোকান ‘স্নেহা মেডিক্যাল’-এর সহায়তায় শববাহী গাড়ি ও প্রয়োজনীয় কর্মীদের ব্যবস্থা করে রতনবাবু ঘাটে শুভাশিসের দাহকার্য সম্পন্ন করেন। বাবার অভিযোগ, তাঁর অনুপস্থিতিতে এবং এত তাড়াহুড়ো করে দাহ করার পেছনে নিশ্চিতভাবেই কোনো অপরাধ ঢাকবার চেষ্টা করা হয়েছে।
বর্তমানে এই ঘটনার জট কাটাতে সিঁথি থানার পুলিশ কোমর বেঁধে নেমেছে। ওই এলাকার প্রত্যক্ষদর্শী, আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় ওষুধের দোকানদারদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এমনকি প্রকৃত ঘটনা খতিয়ে দেখতে এবং ওই ঘরের ভেতর কোনও ধস্তাধস্তি বা বিষক্রিয়ার প্রমাণ রয়েছে কি না, তা জানতে মৃতের বাসভবনে পৌঁছেছে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দল। তাঁরা ঘর থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ময়নাতদন্তের আগেই দেহ দাহ হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসকের বয়ান ও ফরেনসিক রিপোর্টের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হচ্ছে। সম্পূর্ণ তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ না হলে এবং সমস্ত তথ্যপ্রমাণ হাতে না এলে এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে এটি একটি স্বাভাবিক অসুস্থতাজনিত মৃত্যু নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কোনও ঠাণ্ডা মাথার খুন।















