আজকাল ওয়েবডেস্ক: পৃথিবীর একেবারে প্রান্তে এমন একটি জায়গা আছে যেখানে শুধু বরফ, নীরবতা এবং অন্ধকারই বিরাজমান। সেখানে মানব সভ্যতার কোনও চিহ্ন নেই। যে জায়গাটির কথা বলা হচ্ছে, সেটা নরওয়ের একটি ছোট এলাকা। এর নাম লংইয়ারবিন। এটা একটা দ্বীপ যা উত্তর মেরুর খুব কাছে অবস্থিত। এখানে মাসের পর মাস সূর্যের আলো দেখা যায় না এবং তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নীচে থাকে। তবে এই জায়গাটি মেরু ভাল্লুকদের বাসস্থান। এখানেই মানবজাতি ভবিষ্যতের জন্য তাদের সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার লুকিয়ে রেখেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থান
এই জায়গাটিতে একটি পাহাড় আছে, যাকে বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থান বলা হয়। এর নাম সভালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্ট, যা সাধারণত ‘ডুমসডে ভল্ট’ নামে পরিচিত। এখানেই মানব সভ্যতাকে পুনর্নির্মাণের সূত্রটি নিহিত আছে। প্রাথমিকভাবে এটা গ্লোবাল সিড ভল্ট হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে সারা বিশ্বের ফসলের বীজ নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে যদি কখনও কোনও বৈশ্বিক বিপর্যয় ঘটে, তবে কৃষি ও জীবন আবার শুরু করা যায়।

সমগ্র ডিজিটাল সভ্যতার ব্যাকআপ
পরে এই পাহাড়ের ভেতরে আরেকটি মিশন হাতে নেওয়া হয়, যার নাম আর্কটিক ওয়ার্ল্ড আর্কাইভ। এর অর্থ হল, এখন এখানে শুধু বীজ নয়, বরং সমগ্র ডিজিটাল সভ্যতার একটি ব্যাকআপও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ধারণাটি হল, পৃথিবী যদি ইন্টারনেটবিহীন হয়ে যায়, সার্ভার পুড়ে যায় বা ডেটা মুছে যায়, তবুও মানবজাতির জ্ঞান সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যাবে না। এই কারণেই বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ডিজিটাল সম্পদ এখানে জমা রেখেছে। ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির সোর্স কোড পর্যন্ত সবকিছুই এই বরফের ভল্টে সুরক্ষিত আছে।

ভারত এই স্থানে কী সংরক্ষণ করেছে?
ভারত এখানে শুধু প্রযুক্তিগত নথিই নয়, তার সাংস্কৃতিক পরিচয়ও ডিজিটাল আকারে সংরক্ষণ করেছে। তাজমহলের থ্রিডি ডিজিটাল রেকর্ড, সংবিধানের একটি অনুলিপি, বিরল পাণ্ডুলিপি এবং ইসরোর গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলোর ডেটাও ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য এখানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

হায়দ্রাবাদের ইক্রিস্যাট এবং ভারতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এক লাখেরও বেশি বীজের নমুনা এখানে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জোয়ার, বাজরা এবং রাগি-র মতো বাজরা শস্য, সেইসঙ্গে ডাল ও ধানের বিরল জাত। এই সমস্ত বীজ সিল করা পাত্রে রাখা আছে, যার মালিকানা সম্পূর্ণরূপে ভারতের।

কীভাবে ডেটা মহাপ্রলয় থেকে সুরক্ষিত থাকবে?
আর্কটিক ওয়ার্ল্ড আর্কাইভের সবচেয়ে বড় শক্তি হল এটা সম্পূর্ণ অফলাইন। এখানে কোনও ইন্টারনেট সংযোগ নেই, তাই হ্যাকিংয়েরও কোনও সুযোগ নেই। তথ্যগুলো একটি বিশেষ ফিল্মে রেকর্ড করা হয়, যা বিদ্যুৎ ছাড়াই শত শত বছর ধরে সুরক্ষিত থাকতে পারে। প্রাকৃতিক বরফ বা পারমাফ্রস্টই এই নিরাপত্তার প্রধান উৎস। এমনকী যদি পুরো বিশ্ব অন্ধকারে ডুবে যায়, তবুও এখানে সংরক্ষিত তথ্য সুরক্ষিত থাকবে। এর একমাত্র উদ্দেশ্য হল মানবতাকে সংরক্ষণ করা। একারণেই এই বরফের গুহাটিকে ভবিষ্যতের ব্ল্যাক বক্স বলা হয়, যেখানে মানব সভ্যতার পরিচয় শান্তিতে তার সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে।