আজকাল ওয়েবডেস্ক: ১০৫ বছর বয়সে পা দিলেন চীনের লং মার্চের শেষ জীবিত সৈনিক ওয়াং কুয়ানইং। গত ২৫ জুন সিচুয়ান প্রদেশে ধুমধাম করে তাঁর জন্মদিনটি উদযাপন করা হয়েছে। এ বছর চীনের সেই ঐতিহাসিক লং মার্চ বিজয়ের ৯০তম বার্ষিকী। এই বিশেষ মুহূর্তে শতায়ু পার করা এই সেনানীকে শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর সিচুয়ানের ডুজিয়াংইয়ানের বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA)-এর একদল তরুণ সেনা।
হুইলচেয়ারে বসা, গায়ে রেড আর্মির সেই পুরনো জলপাই রঙের উর্দি, আর মাথায় লাল তারার টুপি—১০৫ বছরের এই বৃদ্ধা যখন তরুণ সেনাদের সামনে তাঁর কাঁপা কাঁপা হাতটি কপালে ঠেকিয়ে কুর্নিশ জানালেন, তখন ঘরের পরিবেশ আবেগঘন হয়ে ওঠে। নিজের পুরনো ইউনিফর্মে হাত বুলিয়ে এবং ব্যাটালিয়ানের পতাকার দিকে তাকিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সময় তাঁর চোখ দুটো যেন ফিরে গিয়েছিল প্রায় এক শতাব্দী আগের সেই উত্তাল দিনগুলোয়।
জন্মদিন উপলক্ষে এই প্রবীণ যোদ্ধার হাতে তুলে দেওয়া হয় এক বিশেষ উপহার। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজি এবং কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটি অব ঝেজিয়াং-এর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মিলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে ওয়াংয়ের দুটি কিশোরী বয়সের প্রতিকৃতি তৈরি করেছিলেন। একটিতে দেখা যাচ্ছে ১৯৩৫ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে যখন তিনি রেড আর্মিতে যোগ দেন, সেই সময়ের অবয়ব। আর অন্যটি তার ঠিক দু'বছর পরের, যখন লং মার্চের কঠিন পথ পাড়ি দিতে গিয়ে দলছুট হয়ে পড়েছিলেন ১৬ বছরের এক কিশোরী। নিজের সেই ফেলে আসা চেনা মুখ দুটি দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন বৃদ্ধা। মুখে ফুটে ওঠে এক চিলতে অমলিন হাসি, আলতো করে দেখান বুড়ো আঙুল।
১৯২১ সালে সিচুয়ান প্রদেশের জিনচুয়ান কাউন্টিতে জন্ম নেওয়া ওয়াং কুয়ানইং মাত্র ১৪ বছর বয়সেই দেশ ও আদর্শের টানে নাম লেখান রেড আর্মিতে। ফোর্থ ফ্রন্ট আর্মির নার্স ও লজিস্টিক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। চিয়াং কাই-শেক-এর নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে কমিউনিস্টদের সেই ঐতিহাসিক ১০,০০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ ও দুর্গম পথযাত্রায় সামিল ছিলেন তিনিও। সেই যাত্রাপথে ১৮টি পর্বতমালা আর ২৪টি উত্তাল নদী পার হতে হয়েছিল তাদের। বরফে ঢাকা পাহাড় পেরোনোর সময় তীব্র ঠান্ডায় ফ্রস্টবাইটের শিকারও হয়েছিলেন ওয়াং। এরপর ১৯৩৬ সালে এক সামরিক অভিযানের সময় নিজের দলের থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি।
দলছুট হওয়ার পর সিচুয়ানের ওয়েনচুয়ানে এসে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যান ওয়াং। আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই কাটছিল দিন। দীর্ঘ কয়েকটা দশক তিনি কাউকেই জানতে দেননি যে, তিনি একসময়ের সেই ঐতিহাসিক লং মার্চের লড়াকু সৈনিক ছিলেন। অবশেষে ঘটনার প্রায় ৪৮ বছর পর, ১৯৮৪ সালে সরকারিভাবে তাঁর পরিচয় যাচাই করা হয় এবং তাঁকে বীর মুক্তিযোদ্ধা বা সামরিক প্রবীণ সৈনিকের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
আজ যখন চীনের লং মার্চের আর কোনও সাক্ষী বেঁচে নেই, তখন ১০৫ বছর বয়সী ওয়াং কুয়ানইং এক জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর এই জন্মদিন কেবল একটি সংখ্যার উদযাপন নয়, বরং এক অদম্য লড়াই ও সহনশীলতার ইতিহাসের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।















