রান্নাঘরের ধোঁয়ায় চোখ জ্বলুক কিংবা নির্ঘুম রাতে সন্তানকে কোলে নিয়ে পায়চারি—গৃহস্থালির এই অমানুষিক পরিশ্রমকে আমাদের সমাজ চিরকালই ডেকে এসেছে ‘স্ত্রীর পরম কর্তব্য’ নামে। কোনওদিন কি কেউ ভেবেছেন, বাজারমূল্যে এই ভালবাসার খাটুনির দাম কত হতে পারে?

উত্তরটা দিয়ে দিলেন আটলান্টার বিতর্কিত উদ্যোক্তা ও ধর্মযাজক ইয়াহদান ইয়াদা এবং তাঁর স্ত্রী আজা ইয়াদা। তাঁদের সংসারের হিসেব-নিকেশ শুনে এখন তোলপাড় পুরো নেটদুনিয়া! কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই, কোনো লিখিত চুক্তিপত্র নেই, স্রেফ পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে স্ত্রীকে সংসার সামলানোর জন্য বছরে ২ কোটি টাকারও বেশি ‘মাইনে’ দিচ্ছেন স্বামী!

গল্পটা কিন্তু এখানেই শেষ নয়,আসল চমক লুকিয়ে আছে আরও গভীরে।

যে কাজকে সমাজ ‘মাতৃত্বের পরম আনন্দ’ বলে এড়িয়ে যায়, তাকেই এক কঠিন ও দায়িত্বপূর্ণ ‘লেবার’ বা শ্রমের তকমা দিয়েছেন ইয়াহদান। তাঁর মতে, পেটে সন্তানধারণ করা এবং তাকে বড় করে তোলা মোটেও জলভাত নয়। তাই এই দম্পতির নিজস্ব আর্থিক মডেলে—

গৃহস্থালি পরিচালনার বেতন: সংসার চালানো ও বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য আজা পাচ্ছেন বছরে ২ লক্ষ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ টাকা)।

প্রতিটি সন্তানের জন্ম ও প্রতিপালন: গর্ভাবস্থার ধকল সহ্য করা এবং সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য প্রতিটি বাচ্চার পিছু বরাদ্দ অতিরিক্ত ১ লক্ষ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ১ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা)।

সম্প্রতি খবর এসেছে, এই দম্পতি তাঁদের পঞ্চম সন্তানকে স্বাগত জানাতে চলেছেন! নেটপাড়ার জাঁদরেল হিসাবরক্ষকরা ক্যালকুলেটর নিয়ে বসে পড়েছেন ইতিমধ্যেই। সব হিসাব কষে দেখা যাচ্ছে, সব মিলিয়ে স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে ঢোকা টাকার পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে ১০ কোটি টাকারও বেশি!

 

?utm_source=ig_web_button_share_sheet

 

সোশ্যাল মিডিয়ায় এই খবর চাউর হতেই যেন দুটো মেরুতে বিভক্ত হয়ে গেছে আধুনিক সমাজ। আগুন ঝরছে কমেন্ট সেকশনে।
এক দলের বক্তব্য— "এটাই তো আসল নারী সম্মান!" তাঁদের মতে, একজন নারী তাঁর কেরিয়ার, শরীর এবং সময় বিসর্জন দিয়ে ঘর সামলান। সেই অসংগঠিত শ্রমকে স্রেফ 'ভালবাসা'র মোড়কে মুড়ে না রেখে এভাবে আর্থিক স্বীকৃতি দেওয়াটা এক প্রগতিশীল চিন্তা।

অন্যদিকে ধেয়ে এসেছে তীব্র কটাক্ষের বাণ। সমালোচকদের একাংশের দাবি, "বিয়েটা কি তবে কোনও কর্পোরেট সার্ভিস ডিল?" তাঁদের মতে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে পারস্পরিক বিশ্বাস, দায়িত্ব ও ভালবাসার ওপর ভিত্তি করে। সেটাকে স্রেফ বেতন আর বোনাসের দাঁড়িপাল্লায় মাপলে তো সম্পর্কের পবিত্রতাই নষ্ট হয়ে যায়!


বিতর্ক যতই তুঙ্গে উঠুক, অর্থনীতিবিদরা কিন্তু বিষয়টিকে খুব হেলাফেলা করছেন না। তাঁদের মতে, বিশ্বজুড়ে গৃহিনীদের অলিখিত শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে বহু বছর ধরেই চর্চা চলছে। রান্না করা, ঘর মোছা, বাচ্চাদের সামলানো—এগুলো যদি কোনও এজেন্সিকে দিয়ে করানো হতো, তবে তার মাসিক খরচ হতো আকাশছোঁয়া! অথচ দেশের জিডিপি-তে এই শ্রমের কোনও অবদান ধরা হয় না।

তবে বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট সতর্কবার্তা— "সবাই যেন একে আদর্শ মডেল ভেবে ভুল না করেন।" কারণ কোটি টাকার এই খেলা শুধুই উচ্চবিত্তের বিলাসিতা। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে ভালবাসা ও আয়ের ভারসাম্যই শেষ কথা, সেখানে এমন চুক্তি হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই নয়।

তবুও, আটলান্টার এই দম্পতি একটা প্রশ্ন কিন্তু আমাদের সমাজের মুখে ছুঁড়ে দিয়ে গেছেন— স্বামীর উপার্জনে স্ত্রীর সমান অধিকার যদি স্বাভাবিক হয়, তবে স্ত্রীর অমূল্য শ্রমের কি কোনও নির্দিষ্ট দাম থাকা কি উচিত নয়?