আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভেনেজুয়েলায় সম্প্রতি পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে। ৭.১ ও ৭.৫ মাত্রার এই ভূমিকম্পকে গত একশো বছরের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ঘটনাটির আরেকটি দিক বিশ্বজুড়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনেক ব্যবহারকারী দাবি করেছেন, ভূমিকম্প অনুভব করার কয়েক সেকেন্ড আগেই তাঁদের অ্যান্ড্রয়েড ফোনে গুগলের সতর্কবার্তা পৌঁছে গিয়েছিল।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একাধিক ব্যবহারকারী স্ক্রিনশট শেয়ার করে দেখিয়েছেন যে, গুগল তাদের ফোনে ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা পাঠিয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছে, ভূমিকম্প আঘাত হানার আগেই গুগল কীভাবে বুঝতে পারল যে কম্পন আসছে?


এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আধুনিক স্মার্টফোন প্রযুক্তির মধ্যে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে একটি বিশেষ সেন্সর থাকে, যার নাম অ্যাক্সেলেরোমিটার। সাধারণত এই সেন্সর ফোনের স্ক্রিন ঘোরানো বা নড়াচড়া শনাক্ত করার কাজ করে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি ক্ষুদ্র কম্পন বা কাঁপুনিও শনাক্ত করতে সক্ষম।


যখন কোনও অ্যান্ড্রয়েড ফোন এমন কম্পন শনাক্ত করে যা ভূমিকম্পের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে, তখন সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুগলের অ্যানড্রয়েড আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেম একটি সংকেত পাঠায়। সেই সংকেতের সঙ্গে ফোনটির আনুমানিক অবস্থান সম্পর্কিত তথ্যও চলে যায়।


এরপর গুগলের সার্ভার আশপাশের অসংখ্য ফোন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে। যদি একই এলাকায় বহু ফোন একই ধরনের কম্পন শনাক্ত করে, তাহলে গুগল বুঝতে পারে যে ভূমিকম্প ঘটতে চলেছে বা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। তখনই দ্রুত সতর্কবার্তা পাঠানো হয় সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ব্যবহারকারীদের কাছে।


বিশ্বজুড়ে ২০০ কোটিরও বেশি অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস এই ব্যবস্থার অংশ। ফলে এটি কার্যত বিশ্বের বৃহত্তম ‘বিতরণকৃত সিসমোগ্রাফ’ বা ভূমিকম্প শনাক্তকারী নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ভূমিকম্পের আগে সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব হয় কীভাবে? আসলে ভূমিকম্প একবারে ঘটে না, বরং বিভিন্ন ধরনের তরঙ্গের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।


ভূমিকম্পের প্রথম ধাক্কা আসে ‘পি-ওয়েভ’ বা প্রাইমারি ওয়েভের মাধ্যমে। এটি তুলনামূলক দ্রুতগতির হলেও খুব বেশি ক্ষতিকর নয়। এর গতি প্রায় ৬ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড। পরে আসে ‘এস-ওয়েভ’ বা সেকেন্ডারি ওয়েভ, যা তুলনামূলক ধীরগতির হলেও অধিকাংশ ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দায়ী।


ফোনের সেন্সর পি-ওয়েভ শনাক্ত করেই গুগলকে তথ্য পাঠায়। যেহেতু মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংকেত আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে পৌঁছে যায়, তাই গুগল ভূমিকম্পের মূল ধাক্কা পৌঁছানোর আগেই সতর্কতা পাঠানোর সময় পেয়ে যায়।


উদাহরণস্বরূপ, যদি ভূমিকম্পের কেন্দ্র আপনার অবস্থান থেকে ৩৪০ কিলোমিটার দূরে হয়, তাহলে ভূমিকম্পের তরঙ্গ আপনার কাছে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে। কিন্তু ফোন থেকে পাঠানো সংকেত মুহূর্তের মধ্যেই গুগলের সার্ভারে পৌঁছে যাবে। ফলে কয়েক সেকেন্ডের মূল্যবান সময় পাওয়া সম্ভব হয়।


বর্তমানে অ্যান্ড্রয়েডে দুই ধরনের সতর্কতা ব্যবস্থা রয়েছে— ‘Be Aware Alert’ এবং ‘Take Action Alert’। প্রথমটি হালকা কম্পনের জন্য সতর্ক করে, আর দ্বিতীয়টি মাঝারি বা শক্তিশালী কম্পনের আগে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।


অ্যান্ড্রয়েড ৫ বা তার পরবর্তী সংস্করণ চালিত ফোনে এই সুবিধা পাওয়া যায়। তবে সতর্কবার্তা পেতে হলে মোবাইল ডেটা বা ওয়াই-ফাই সংযোগ সক্রিয় থাকতে হবে।


প্রযুক্তির এই অভিনব ব্যবহার প্রমাণ করেছে, কোটি কোটি স্মার্টফোন একসঙ্গে কাজ করলে শুধু যোগাযোগই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম সতর্কতাও দেওয়া সম্ভব। এতে বহু মানুষের জীবন রক্ষা করা যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।