আজকাল ওয়েবডেস্ক: শারদীয়ার ভোর। লন্ডনের আকাশে মেঘ আর কুয়াশার মিশেলে ঝলমলে আকাশ। টেমসের জলের উচ্ছলতা আর ঠান্ডার ছোঁয়ায় সুইস স্কোটেজ লাইব্রেরির অন্দরে। দূরে বাজতে থাকে চেনা সুর—“জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী”। আবেগে কেঁপে ওঠে প্রবাসী বাঙালির মন জানা যায় মা আসছেন।
১৯৬৩ সালে, লন্ডনে বাঙালি অভিবাসীর সংখ্যা ছিল অল্প। কয়েকজন তরুণ-তরুণী, পড়াশোনা বা কাজের টানে কলকাতা থেকে এসে ভেবেছিলেন বিদেশের নিস্তব্ধতাকে ভাঙতে হলে চাই মায়ের আরাধনা। সুইস কটেজ লাইব্রেরির অন্দরমহলেই প্রথম বাজল ঢাক, জ্বলে উঠল ধূপ, শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হলো প্রবাসী আকাশ। ছোট আয়োজন, সীমিত ভক্তবৃন্দ তবু সেই ক্ষুদ্র পুজোই আজ প্রায় ষাট বছরেও বেশি পেরিয়ে গেল।
কোভিড অতিমারির অন্ধকারে যখন বিশ্ব থমকে গিয়েছিল, তখনও থেমে থাকেনি ক্যামডেনের প্রস্তুতি অতি সাদামাটা প্রতিমা, মুখোশের আড়াল থেকে প্রণাম, আর সীমিত ভোগের আয়োজনে মনে হয়েছিল স্বয়ং উমা টেমসের তীরে নেমে এসেছেন। প্রবাসী বাঙালির জন্য তিনি তখন ছিলেন আশ্বাস, সাহস আর স্নেহের প্রতীক।
প্রতিবছরই ক্যামডেনের পুজো সাজে আলাদা থিমে। কখনো ইতিহাস, কখনো সামাজিক বার্তা, আবার কখনো কেবল শিকড়ের টান। আর ২০২৫ সালে আয়োজকরা বেছে নিয়েছেন এক চিরন্তন অনুভূতি—“মা”।
কমিটির সভাপতি ড. আনন্দ গুপ্ত বললেন, “মা মানে শুধু প্রতিমার সামনে প্রণাম নয়। মা মানে আশ্রয়, সাহস, ভালোবাসা। এবারের থিম সেই অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।”
তাই সুইস কটেজ লাইব্রেরির প্রতিটি কোণ সাজানো হচ্ছে মাতৃত্বের ছায়ায়। আলো-আঁধারির খেলায় প্রতিফলিত হবে উমার স্নিগ্ধ দৃষ্টি, প্রদীপের শিখায় জেগে উঠবে তাঁর স্নেহময় রূপ।
ষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উৎসব। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীতে একেক দিন একেক রঙ। বিশেষ আকর্ষণ নৃত্যানুষ্ঠান আর নটি বিনোদিনী। মহিষাসুরমর্দিনীর সুরের সঙ্গে নাচের ঝঙ্কার লন্ডনের বুকেও তুলবে বাংলার ঢাকের আবেশ।
দশমীতে সিঁদুরখেলায় লাল হয়ে উঠবে সুইস কটেজের আঙিনা, মিশে যাবে শঙ্খ, উলুধ্বনি আর ধুনোর গন্ধ।
ভোজন, বিনোদন আর মিলনমেলা ক্যামেডেন ক্ষেত্রভূমি সেখানে,উৎসব মানেই খাওয়া-দাওয়া। এবারের আয়োজনেও থাকছে মোমো, ফুচকা, রসগোল্লা আর মিষ্টি দই। খাবারের স্টলগুলো আসলে আলাদা উৎসবের কেন্দ্র, শিশুদের জন্য থাকছে বসে আঁকো প্রতিযোগিতা। প্রবাসী শিল্পীদের গান, কবিতা, নাটক আর ধুনুচি নাচে জমে উঠবে সন্ধের আসর।
ক্যামডেন পুজোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ঐশ্বর্য ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন। লন্ডনের শিল্পপতি লক্ষ্মী মিত্তলের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতি বছর এ পুজো পায় অন্যরকম জৌলুস। এ বছর কুমোরটুলি থেকে বিশেষ বিমানে আনা হয়েছে প্রতিমা শিল্প, নান্দনিকতা আর আভিজাত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন।
তবে শুধু আনন্দ নয়, ক্যামডেন পূজো প্রতিবছরই ছড়ায় মানবতার বার্তা। বিভেদ আর অশান্তির পৃথিবীতে মা দুর্গা হয়ে ওঠেন নীরব আহ্বান সমতার জয় মানবতার জয়।
পুজোর সময় সুইস কটেজ লাইব্রেরি যেন বনেদি কলকাতা। লালপাড় শাড়ি, ধুতি-পাঞ্জাবি, শিশুদের কোলাহল সব মিলিয়ে তৈরি তখন অদ্ভুত আবহ। প্রবাসে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের কাছে এটি কেবল উৎসব নয়, শিকড়ের সঙ্গে পরিচয়ের দরজা।
ড. আনন্দ গুপ্তর কথায়, “মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে আমরা বাংলার শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি প্রবাসে ছড়িয়ে দিচ্ছি। আগামী প্রজন্ম যেন এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।”
কলকাতা থেকে হাজারো মাইল দূরে লন্ডনে দাঁড়িয়েও যখন ঢাক বাজে, মনে হয় আমরা ঘরে ফিরেছি। হয়তো এই ঘর ইট-কাঠের নয়, এই ঘর আমাদের হৃদয়ের। তাই এবারের থিম “মা” আসলে সেই ঘরে ফেরার গল্প চিরন্তন আবেগ, যা সময় আর দূরত্ব মুছতে পারে না।
