আজকাল ওয়েবডেস্ক: নির্মাণকাজ শেষ হলে এটিই হত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাম মূর্তি, যার উচ্চতা হওয়ার কথা ছিল ৮১ ফুট। তবে কট্টরপন্থী ইসলামি সংগঠনগুলোর হুমকির মুখে ওই রাম মূর্তির নির্মাণকাজ! ইতিমধ্যেই মূর্তিটির প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আপাতত সেই কাজ বন্ধ করা হয়েছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় রাম মূর্তি তৈরি নিয়ে বিস্তর চর্চা চলে। ক্রমশ কাজ বন্ধের চাপ বাড়ছিল। শেষপর্যন্ত চাপের কাছেই নতি স্বাকীর করা হল। ইসলামি প্রচারকরা মূর্তিটি ভেঙে ফেলার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। এই ঘটনায় অসন্তোষ বেড়েছে বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমলে বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হল।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উত্তেজনা যখন নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই এই বিতর্ক সামনে এলো। চলতি সপ্তাহের প্রথমেই, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহিদ উর রহমানকে দিল্লির বিমানবন্দরে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ কিছু সময়ের জন্য আটকে রেখেছিল। ভারতের বিরুদ্ধে তাঁর আক্রমণাত্মক মন্তব্যের ইতিহাসের কারণেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছিল। রহমান তাঁর ভারত সফর বাতিল করেন এবং এই "অপমানজনক আচরণ"-এর বিষয়ে ঢাকার তরফে নয়াদিল্লির কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানান হয়েছে।

তাছাড়া, সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের নেতাদের (যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মমতা ব্যানার্জিও ছিলেন) কাছে আম পাঠাতেন। এ বছর তারেক রহমান নেপালে আম পাঠালেও, ভারতের ক্ষেত্রে তিনি এই প্রথা বজায় রাখবেন কি না, তা জানা যায়নি।

ভগবান রামের মূর্তি নিয়ে বিতর্ক কেন?
সম্পর্কের এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশে ভগবান রামের মূর্তি নিয়ে তৈরি বিতর্ক ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়িতে একটি মন্দির কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে ভগবান রামের মূর্তিটি নির্মাণ করা হচ্ছিল। প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রস্তাবিত প্রকল্পটিতে ভগবান রামের ৮১ ফুট, ভগবান কৃষ্ণের ৫০ ফুট এবং ভগবান শিবের ৩০ ফুট উচ্চতার মূর্তি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই প্রকল্পের উদ্যোক্তা 'শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির কমিটি'-র সভাপতি হরিদাস চন্দ্র দাস জানিয়েছেন, সনাতন ধর্মের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অংশ হিসেবেই ভগবান রামের মূর্তিটি নির্মাণ করা হচ্ছিল। তবে দাস জানিয়েছেন, ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িতদের হুমকি দেওয়ার পর নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, আয়োজকদের মধ্যে ভীতিই মূর্তির নির্মাণকাজ বন্ধের অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রকল্পটি শেষ করার বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

মন্দির কমিটির উপদেষ্টা শ্যামলাল কুমার মহন্ত এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, "সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার" স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মহন্ত বলেন, "আইন-শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষ্যে আমরা এই কাজ বন্ধ রাখছি। আমরা কোনও বিবাদের কারণ হতে চাই না, আবার কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতও দিতে চাই না।" তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রত্যেকেরই নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। তারেক রহমানের প্রায়শই ব্যবহৃত একটি উক্তির পুনরাবৃত্তি করে মহন্ত বলেন, "ধর্ম যার যার, কিন্তু রাষ্ট্র সবার।"

বস্তুত, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশে দেওয়া নিজের প্রথম ভাষণে রহমান ঘোষণা করেছিলেন যে- ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়, কিন্তু দেশ "সবার"। বাংলাদেশে হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী সেই বার্তাটি দিয়েছিলেন। 

তবে সাম্প্রতিক এই ঘটনা, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। দেশ যদি সবারই হয়, তবে হিন্দুরা কেন তাদের দেব-দেবীর মূর্তি নির্মাণ করতে পারবে না?

ভগবান রামের ছবি অবমাননা, হিন্দুদের প্রতিবাদ
মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এক বছরেরও বেশি সময় আগে ভগবান রামের মূর্তি নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো নানা বাধা সৃষ্টি করে আসছিল। এছাড়া এই প্রকল্পের অর্থায়নের উৎস তদন্তেরও দাবি তোলা হয়েছিল।

এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে, এক উগ্রপন্থী ইসলামি বক্তার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। যেখানে তিনি হুমকি দিয়েছিলেন যে, সরকার যদি বুলডোজার দিয়ে মূর্তিটি ধ্বংস না করে, তবে তিনি নিজেই তা করবেন।

ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, "রামের একটি মূর্তি তৈরি করা হচ্ছে। বুলডোজার দিয়ে এটি ধ্বংস করুন। সরকার যদি তা না করে, তবে সাধারণ মানুষ (মুসলিমরা) এটি ধ্বংস করবে।"

অতি সম্প্রতি গাইবান্ধায় ইসলামপন্থীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে ভগবান রামের একটি ছবি অবমাননা করা হয়।

এই ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এক বিশাল মশাল মিছিল বের করে এবং অবমাননার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানায়। শিক্ষার্থীরা ভগবান রামের মূর্তি নির্মাণের কাজ ফের শুরু করারও দাবি জানিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা গুরুত্বপূর্ণ শাহবাগ মোড়ে সড়ক অবরোধ করলে সেখানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের প্রদান রাম প্রসাদ সাহা বলেন, "আমাদের কাছে ভগবান রাম হলেন এক অবতার। তাঁর প্রতিমূর্তির দিকে জুতো ছুঁড়ে মারার ঘটনাটি সনাতন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে গভীর আঘাত করেছে।" 

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছে যে, ন্যায়বিচার ও সুরক্ষার সন্ধানে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা প্রায়শই বৈষম্যের শিকার হন। বস্তুত, 'বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ'-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে সাম্প্রদায়িক হিংসতাার ১৩৩টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সংখ্যালঘু সংগঠন হিসেবে পরিচিত এই পরিষদ, রাধা গোবিন্দ মন্দিরের প্রতি হুমকির বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন জানান, ভগবান রামের মূর্তি ভেঙে ফেলার আহ্বান এক ধরণের "তালিবানি মানসিকতা"র প্রতিফলন। 'এক্স' -এ দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে, বাংলাদেশের অন্যত্র যেখানে নতুন নতুন মসজিদ গড়ে উঠছে, সেখানে এই মূর্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে কেন এমন তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, "ধর্মীয় স্বাধীনতা যদি সত্যিই সবার জন্য হয়, তবে তা কেবল সংখ্যাগুরুদের জন্য নয়, বরং সংখ্যালঘুদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।" নাসরিন এক্সে আরও লেখেন, "কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কেবল অপছন্দ হওয়ার কারণেই অন্য কোনও সম্প্রদায়ের উপাসনালয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার অধিকার তৈরি হয় না।"

এই ঘটনাটি বাংলাদেশের ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকারের বিষয়গুলো সামলানোর পদ্ধতি নিয়ে আবারও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্থগিত হয়ে যাওয়া রাম মন্দির নির্মাণ প্রকল্পটির কাজ পুনরায় শুরু হবে কি না, তা থেকে বোঝা যাবে যে সংখ্যালঘু অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি তারেক রহমান কীভাবে মোকাবিলা করেন।