আজকাল ওয়েবডেস্ক: জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা তাঁর দলের সমস্ত বিধায়ক, সাংসদ এবং মন্ত্রীদের নিয়ে রাজধানী শ্রীনগর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দাচিগাম জাতীয় উদ্যান এলাকায় নিয়ে গিয়েছেন। এই এলাকা 'নেটওয়ার্ক-বিহীন' অঞ্চল। এখন প্রশ্ন হল কেন এই পদক্ষেপ? অনেকেরই মনে হতে পারে যে, ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতাদের কাছে এটি হয়তো নিছকই একটি আনন্দভ্রমণ, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সাময়িক বিরতি (ডি-টক্স) বলে মনে হতে পারে। কিন্তু রাজনীতির আঙিনায় এ ধরনের বিষয় ঘটে না বললেই চলে। 

ন্যাশনাল কনফারেন্স সূত্রে খবর, জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা এবং রাজনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধারে বিলম্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এমনকি শাসক দলের অন্দরেই বিদ্রোহের আঁচ। এই প্রেক্ষাপটে দলের ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের লক্ষ্যেই দূরে গিয়ে পর্যালোচনা বৈঠক হবে।

এমরের দলের বিধায়ক ও সাংসদরা গুপকার রোডে অবস্থিত মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর, তাঁদের জন্য অপেক্ষমাণ একটি বাসে তোলা হয়। এরপর সেই সাংসদ, নেতা, মন্ত্রীদের দলটি এক 'অজানা গন্তব্যের' উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। বাসের একেবারে পেছনের আসনে বসে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে এই সফরের ছবি শেয়ার করেন। মুখ্যমন্ত্রী আবদুল্লা জানান, এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য হল গত ১৯ মাসে তাঁর সরকারের কাজকর্মের সামগ্রিক পর্যালোচনা করা। তিনি এই বৈঠককে একটি 'অফ-সাইট' (কর্মস্থল-বহির্ভূত বৈঠক) হিসেবে অভিহিত করেন।

এক্স প্ল্যাটফর্মে করা একটি পোস্টে ওমর লেখেন, "আমরা একটি 'অফ-সাইট' বা কর্মস্থল-বহির্ভূত বৈঠকে যাচ্ছি, যেখানে আমরা গত ১৯ মাসের কাজকর্মের ভাল দিকগুলো, অপেক্ষাকৃত কম ভাল দিকগুলো এবং এর মাঝখানের সবকিছু নিয়ে পর্যালোচনা করে পুরো দিনটি অতিবাহিত করব।"

মুখ্যমন্ত্রীর সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা ছবিগুলিতে বেশ আনন্দঘন পরিবেশের ছবি ফুটে উঠেছে, কিন্তু আসলে ন্যাশনাল কনফারেন্সের তৃণমূল স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশা ও ক্ষোভ দানা বাঁধছে। রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধারে বিলম্ব এবং পরিস্থিতি পরিবর্তনে ওমর আবদুল্লা কার্যত কিছুই করছেন না, এমন ধারণাই এই হতাশার মূল কারণ।

দলের কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে তাঁদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের অক্টোবরে সরকার গঠনের পর ন্যাশনাল কনফারেন্স তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা বা লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে।

ওমর আবদুল্লাহর সবচেয়ে বড় সমালোচক হলেন তাঁর দলেরই শ্রীনগরের সাংসদ আগা রুহুল্লাহ। তিনি প্রকাশ্যে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে জনগণের রায় বা 'ম্যান্ডেট' লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছেন এবং তাঁকে "ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করার" দাবি জানিয়েছেন। বুধবারের এই সফরের জন্য রুহুল্লাহকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এনডিটিভি-কে আগা রুহুল্লাহ বলেন, "আমাকে এই বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।" অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল কনফারেন্সের আন্দরেই বড় ভাঙন বা বিপর্যয় মাথাচাড়া দিয়েছে।

বিজেপি নেতা এবং জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা সুনীল শর্মা এই বৈঠকটিকে ওমর আবদুল্লার জন্য এক ধরণের 'ফ্লোর টেস্ট' (আস্থাভোটের সমতুল্য পরীক্ষা) হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, বিধায়করা এখনও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেই আছেন কি না- তা যাচাই করে দেখাই এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য। বাস ভ্রমণে অংশ নেওয়া ন্যাশনাল কনফারেন্সের এক বিধায়ক জানান, ওমর আবদুল্লাকে অবশ্যই দলের সেই রাজনৈতিক এজেন্ডা এগিয়ে নিতে হবে, যা ২০২৪ সালের দলীয় ইস্তেহারে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন।

দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রের খবর, কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বারবার রাজ্যের পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং নির্বাচিত সরকারকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার আশ্বাস পাওয়ার পরেও, মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছেন।

ন্যাশনাল কনফারেন্সের ই এক বিধায়ক বলেন, "আপনাদের বলি, তারা (কেন্দ্র) কীভাবে জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচিত সরকারকে কার্যত অস্তিত্বহীন করে তুলেছে। আমাদের সরকারের,  একজন 'পাটওয়ারি'র (ভূমি রাজস্ব কর্মী) ওপরও কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। রাজস্ব বিভাগ কাগজে-কলমে নির্বাচিত সরকারের অধীনে থাকলেও, বাস্তবে আমরা একজন পাটওয়ারিকেও বদলি করতে পারি না।" ওই বিধায়কের দাবি, এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হলো পরিস্থিতিকে নতুন করে ঢেলে সাজানো বা 'রিসেট' করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, "আর সবকিছু আগের মতোই চলতে পারে না। আমাদের নিজেদের রাজনীতিকে পুনরুদ্ধার করতেই হবে।"