আজকাল ওয়েবডেস্ক: দলের কর্মীদের যদি তাঁর নেতৃত্বের ওপর আর আস্থা না থাকে তবে তিনি পদ থেকে সরে দাঁড়াতে প্রস্তুত। শিবসেনা (ইউবিটি)-র অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহের আবহে, নজিরবিহীন প্রস্তাব দিলেন উদ্ধব ঠাকরে। মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দলীয় সদস্যরা যদি মনে করেন যে তিনি আর নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নন, তবে তিনি যেকোনও কর্মীর হাতে দলের দায়িত্ব তুলে দিতে রাজি আছেন।
শিবসেনার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় উদ্ধব ঠাকরে বলেন, তিনি "যেকোনও কাউকে" দলের প্রধান করতে প্রস্তুত। দলীয় প্রধানের পদ আঁকড়ে ধরে রাখতে চান না তিনি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, দলের আদর্শের লড়াই তিনি কোনওভাবেই ছাড়বেন না। উদ্ধব ঠাকরের কথায়, "আমি হাল ছাড়ব না। কিন্তু যেদিন আপনারা মনে করবেন যে আমি এই পদের যোগ্য নই, সেদিনই আমি সরে দাঁড়াব।"
উদ্ধব আরও বলেন, কেউ কেউ হয়তো আশা করছে যে দল হতাশ হয়ে পড়বে, কিন্তু শিবসেনা (ইউবিটি) তাদের লড়াই চালিয়ে যাবে। শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর্মীরা এখন নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, যাঁরা সংগঠনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নির্দেশ একসময় বালাসাহেবই দিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, চলতি সপ্তাহেই দলের ন'জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ছয়'জনই বিদ্রোহ ঘোষণা করে সম্প্রতি নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন এবং সংসদীয় দলের বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার এই সংকট আরও বাড়ে। জানা যায়, বিদ্রোহী সাংসদরা একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনায় যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় উদ্ধব ঠাকরে তাঁর দল থেকে সাংসদদের চলে যাওয়ার ঘটনায় ভোটারদের কাছে ক্ষমা চান। বলেন, "আজ আমি ভোটারদের কাছে ক্ষমা চাইছি কারণ তাঁরা আমাদের ভোট দিয়েছিলেন, অথচ আমাদের সাংসদরা দল ছেড়ে চলে গিয়েছেন।"
উদ্ধব প্রশ্ন তোলেন, বিদ্রোহী সাংসদের কথায় আমি নাকিনাগেলের বাইরে থাকি। যদি সত্যিই নাগালের বাইরে থাকি তবে তাঁরা কীভাবে নির্বাচনে জয়ী হলেন? ঠাকরে কংগ্রেসের সঙ্গে শিবসেনা (ইউবিটি)-র জোটের বিষয়টি জোরালোভাবে সমর্থন করলেও দলটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার জল্পনা জোর দিয়ে খারিজ করে দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "আমরা যদি ৩০ বছর ধরে বিজেপির সঙ্গে থেকেও তাদের দলে মিশে না গিয়ে থাকি, তবে কংগ্রেসের সঙ্গে কীভাবে মিশব?" তিনি বলেন, অতীতে কংগ্রেসের সঙ্গে শিবসেনার রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও, দল "কখনও 'মাতোশ্রী'-কে অপমান করেনি" এবং নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে। বিজেপির প্রতি তীব্র কটাক্ষ করে তিনি মন্তব্য করেন যে, বিজেপির 'হিন্দুত্ব'-এর চেয়ে কংগ্রেস অনেক ভাল।
এটি কেবল ট্রেলার, আসল ছবি এখনও বাকি: একনাথ শিন্ডে
শিবসেনার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী তথা শিবসেনা প্রধান একনাথ শিন্ডে উদ্ধব ঠাকরের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। তিনি অভিযোগ করেন যে, কংগ্রেস ও এনসিপি-র সঙ্গে জোট বেঁধে উদ্ধব ঠাকরে বালাসাহেব ঠাকরের আদর্শ পরিত্যাগ করেছেন।
মহাবিকাশ আঘাড়ি জোটের প্রসঙ্গ টেনে শিন্ডে বলেন, "যাঁরা একসময় বালাসাহেবের নিন্দা করতেন, আজ আপনারা তাঁদেরই পুজো করছেন। এনসিপি ও কংগ্রেস, শিবসেনাকে ভেঙেছিল, আর এখন আপনারা তাঁদেরই কোলে গিয়ে বসেছেন।"
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে শিন্ডে বলেন যে এটি কেবল শুরু মাত্র। তিনি বলেন, "এটি তো কেবল ট্রেলার, আসল ছবি এখনও বাকি। অপেক্ষা করুন আর দেখুন এরপর কী হয়।" তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, তাঁর গোষ্ঠীই বালাসাহেব ঠাকরের স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, "আমি বালাসাহেব ঠাকরের স্বপ্ন পূরণ করেছি। আমরা বালাসাহেবকে গর্বিত করেছি।"
উদ্ধব ঠাকরেকে পরোক্ষভাবে আক্রমণ করে শিন্ডে বলেন, "বাঘ আপনাদের সামনেই রয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে কিছু কুকুর ঘেউ-ঘেউ করছে। ওরা দল বেঁধে ঘেউ-ঘেউ করে, কিন্তু বাঘ একা আসে। এটাই শিবসেনা।"
আক্রমণের ঝাঁঝ আরও বাড়িয়ে শিন্ডে বলেন, "কোনো বড় পদক্ষেপ বা 'অপারেশন' চালানোর জন্য বাঘের মতো কলিজা বা সাহস থাকা প্রয়োজন। নেকড়ে দিয়ে কোনও অপারেশন হয় না।" তাঁর এই মন্তব্যকে উদ্ধব-নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তাঁর বিদ্রোহের প্রসঙ্গ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
উদ্ধব ঠাকরে যখন বিজেপিকে নিশানা করছিলেন, তখন শিন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মহারাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন এনডিএ-র প্রশংসা করেন, দলীয় কর্মীদের প্রধানমন্ত্রীর কাজের জন্য তাঁকে সাধুবাদ জানানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "দেশের জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদি যে কাজ করছেন, তার জন্য বালাসাহেব নিশ্চয়ই তাঁর পিঠ চাপড়ে দিতেন।" তিনি এও জোর দিয়ে বলেন যে 'মহাযুতি' জোট অটুট রয়েছে। তিনি যোগ করেন, "কিছু মানুষ আমার ও দেবেন্দ্র ফড়নবিশের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করছে, কিন্তু আমরা একে অপরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত।"
উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা (ইউবিটি) ২০২২ সালে দল ভাঙার পর থেকে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছে। সে সময় একনাথ শিন্ডে দল থেকে বেরিয়ে এসে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করেছিলেন। উদ্ধব সেনার ন'জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ছয়'জন দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে প্রতিদ্বন্দ্বী সেনা গোষ্ঠীর দিকে ঝুঁকেছেন। তাঁরা লোকসভার স্পিকারের কাছে চিঠি জমা দিয়ে একটি পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি চেয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
বিদ্রোহীদের অভিযোগ, দলটি বালাসাহেব ঠাকরের আদর্শ থেকে সরে আসছে। পাশাপাশি কংগ্রেসের সঙ্গে ইউবিটি সেনার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা নিয়েও তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঠাকরে শিবির অবশ্য এই অভিযোগগুলি খারিজ করে দিয়েছে এবং বিদ্রোহী সাংসদদের নোটিশ পাঠানোর পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।















