আবু হায়াত বিশ্বাস
নিট প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে আন্দোলনরত ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। সংসদ থেকে রাস্তা— সর্বত্র সরব হয়েছেন তিনি।
কখনও ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচিতে, কখনও বা দিল্লিতে ছাত্র-আন্দোলনের পাশে দাড়িয়েছেন। বুধবার দিল্লিতে কংগ্রেস সদর দপ্তরে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, আন্দোলনকারী ছাত্ররা কোনও সন্ত্রাসবাদী নন।
তাঁরা শুধু একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য ও কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা চাইছেন। ছাত্রদের ওপর পুলিশি হামলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে কংগ্রেস সম্পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছে।
বিরোধী দলনেতার বক্তব্য, ছাত্র-আন্দোলনে সরকার ভয় পেয়েছে। সরকার চরম আতঙ্কে আছে। ছাত্রদের ইস্যুতে সরকারের অবস্থানই প্রমাণ করছে যে কেন্দ্র মানসিকভাবে চাপে রয়েছে। এদিন সাংবাদিক বৈঠকের শুরুতেই সংসদ অভিযানের সময় ছাত্রদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগের ভিডিও দেখানো হয়।
এরপর রাহুল বলেন, ‘ছাত্ররা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করছে। অথচ তাদের লক্ষ্য করে অস্ত্র তাক করা হচ্ছে, লাঠিপেটা করা হচ্ছে। তারা শুধু এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চাইছে, যা তাদের প্রাপ্য।’

মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধর্না থেকে তাঁকে টেনে হিঁচড়ে তুলে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। তাঁর নাকের নিচে রক্তও দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কংগ্রেস নেতার দাবি,‘আমার সঙ্গে কী হয়েছে, তা আমার কাছে একেবারেই গুরুত্বহীন। আমাকে আরও পাঁচ গুণ খারাপভাবে ব্যবহার করা হলেও আমার কিছু যায় আসে না। আসল বিষয় হল শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রশ্নফাঁস এবং নিট পরীক্ষা।’
বিরোধী দলনেতা হিসেবে তিনি সীমা লঙ্ঘন করেছেন বলে সরকারের অভিযোগ প্রসঙ্গে রাহুলের প্রতিক্রিয়া,‘ওই অভিযোগের কোনও গুরুত্বই আমার কাছে নেই।’ কংগ্রেসের দাবি, সরকারের উচিত বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণের বদলে নিট প্রশ্নফাঁস, ছাত্রদের ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট নিয়ে জবাব দেওয়া।
রাহুলও এদিন একই সুরে বলেন, ব্যক্তিগত ঘটনাকে সামনে এনে মূল ইস্যু থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু কংগ্রেস ছাত্রদের ন্যায্য দাবির প্রশ্নে আপস করবে না। রাহুলের অভিযোগ, গত এক দশকে দেশে ১৫২টি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, অথচ একটিও দোষী সাজা পায়নি।
তাঁর দাবি, এই ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থার ফলে ৭.৫ কোটি ছাত্রছাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতি বছর পরীক্ষার জন্য পরিবারগুলিকে প্রায় ১.৩২ লক্ষ কোটি টাকা খরচ করতে হয়, যা কেন্দ্রের শিক্ষা বাজেটের প্রায় সমান।
রাহুল বলেন, শিক্ষা শেষ করার পরও ছাত্রদের সামনে কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। উৎপাদন, কর্পোরেট চাকরি, সরকারি চাকরি—সব ক্ষেত্রেই সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। তার ওপর প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনায় ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
রাহুলের দাবি, ‘শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান তাঁর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর পদত্যাগ করা উচিত।’ সাংবাদিক বৈঠকে সংসদের অচলাবস্থা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রাহুল বলেন, ‘আমাদের দাবিগুলি নিয়ে কোনও আপস হবে না। তবে আগামীকাল সংসদ চলবে কি না, তা বিরোধী দলগুলির ওপর নির্ভর করছে।’
রাহুল বলেন, ‘প্রতিটি সরকারেরই এমন একটা সময় আসে, যখন তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এই সরকার এখন আতঙ্কে রয়েছে।’ কংগ্রেসের দাবি, সংসদে ছাত্রদের ইস্যুতে আলোচনার সুযোগ না দেওয়ায় বাধ্য হয়েই তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান-বিক্ষোভে বসেছিলেন।
অন্যদিকে, বিজেপি রাহুলকে তীব্র আক্রমণ করে বলেছে, তাঁর আচরণ শিশুসুলভ। প্রধান মন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধর্নায় বসে বিরোধী দলনেতা পদের অপব্যবহার করেছেন রাহুল। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র নেতৃত্বে চলা আন্দোলন নিয়ে কেন্দ্রের অবস্থানের সপক্ষে সওয়াল করল বিজেপি।
বুধবার দলের সাংসদ বাঁশুরি স্বরাজ দাবি করেন, সরকার শুরু থেকেই আন্দোলনের প্রতি সংবেদনশীল মনোভাব দেখিয়েছে এবং আলোচনার পথ কখনও বন্ধ করেনি। একইসঙ্গে বিরোধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার অভিযোগও তোলেন তিনি।
দিল্লিতে এক সাংবাদিক বৈঠকে বাঁশুরি স্বরাজ বলেন, সিজেপি-র আন্দোলনকে ছাত্র আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং সেই কারণেই কেন্দ্র অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে।
তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডার সঙ্গে বৈঠকের পর আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা আন্দোলন না চালানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তাঁরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। বিজেপি সাংসদের অভিযোগ, কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলি দেশে পরীক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে বলে যে প্রচার চালাচ্ছে, তা বাস্তবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
















