আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রায় এক বছর পর প্রথমবারের মতো অপারেশন সিন্দুরে শহিদ হওয়া ছয় ভারতীয় সেনা সদস্যের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করল কেন্দ্রীয় সরকার। শুক্রবার এই তথ্য সামনে আসে। এতদিন পর্যন্ত অভিযানের নিরাপত্তা এবং কৌশলগত কারণে সেনাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তবে এবার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের আত্মত্যাগের কথা স্বীকার করে নাম প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।
অপারেশন সিন্দুর ছিল ভারতের একটি সীমান্ত-পার সামরিক অভিযান, যা গত বছরের মে মাসে পাকিস্তান এবং পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছিল। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল সীমান্তের ওপার থেকে সক্রিয় জঙ্গি কাঠামো ধ্বংস করা এবং ভবিষ্যতের হামলার সম্ভাবনা রোধ করা।
অপারেশন সিন্দুর দেশের সেবায় প্রাণ উৎসর্গ করা ছয় ভারতীয় সেনা সদস্যের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তাঁদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে জাতীয় যুদ্ধ স্মারকের ২০২৫ সালের অংশে থাকা ওয়াল 3D-তে তাঁদের নাম খোদাই করা হয়েছে। এই অংশটি দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়া সেনা সদস্যদের স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছে।
কেন্দ্রের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, অপারেশন সিন্দুরে শহিদ হওয়া ছয় বীর সেনা হলেন—
সুবেদার মেজর পবন কুমার — হেডকোয়ার্টার্স ১০ ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড
রাইফেলম্যান সুনীল কুমার (বীর চক্র) — ৪ জম্মু ও কাশ্মীর লাইট ইনফ্যান্ট্রি
ল্যান্স নায়েক দিনেশ কুমার — ৫ ফিল্ড রেজিমেন্ট এভিয়েশন টেকনিশিয়ান মুড মুরালিনায়ক — ৮৫১ লাইট রেজিমেন্ট
হাবিলদার সুনীল কুমার সিং — ২৩৭ ফিল্ড ওয়ার্কশপ কোম্পানি
সার্জেন্ট সুরেন্দ্র কুমার (বায়ু মেডেল) — ৩৯ উইং
এই সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর। ওই হামলায় অন্তত ২৬ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন। পর্যটকদের লক্ষ্য করে চালানো সেই হামলার পর দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি ওঠে।
এরপরই ভারতীয় সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে অপারেশন সিন্দুর পরিচালনা করে। সরকারি সূত্রের দাবি, এই অভিযানে সীমান্তের ওপারে একাধিক জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির, অস্ত্রভাণ্ডার এবং সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো ধ্বংস করা হয়। যদিও পাকিস্তান সেই দাবি অস্বীকার করেছিল, ভারত জানায় যে অভিযানের লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র জঙ্গি ঘাঁটি, কোনও সাধারণ নাগরিক বা অসামরিক পরিকাঠামো নয়।
তবে এই অভিযানের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীকেও মূল্য দিতে হয়েছে। অভিযানের সময় ছয়জন সেনা সদস্য দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেন। তাঁদের আত্মত্যাগের কথা এতদিন সরকারি স্তরে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এবার কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের নাম প্রকাশের মাধ্যমে তাঁদের বীরত্ব এবং আত্মবলিদানকে সম্মান জানানো হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবেদনশীল সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে অনেক সময় নিরাপত্তার স্বার্থে শহিদ সেনাদের পরিচয় প্রকাশে বিলম্ব করা হয়। অভিযানের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন তথ্য গোপন রাখা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত পরিকল্পনা রক্ষার জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে। সেই কারণেই অপারেশন সিন্দুরের ক্ষেত্রে প্রায় এক বছর পর এই ঘোষণা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শহিদ সেনাদের পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে তাঁদের আত্মত্যাগের প্রশংসা করা হয়েছে। দেশের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মত প্রকাশ করেছেন বহু প্রাক্তন সেনা আধিকারিক এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক।
অপারেশন সিন্দুরকে ভারতের সাম্প্রতিকতম গুরুত্বপূর্ণ সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক পদক্ষেপগুলির অন্যতম বলে মনে করা হচ্ছে। কেন্দ্রের এই ঘোষণার মাধ্যমে শুধু শহিদ সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধাই জানানো হয়নি, বরং দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় তাঁদের আত্মত্যাগের ইতিহাসও আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হল। দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা এই ছয় বীর সেনার আত্মবলিদান ভারতবাসীর কাছে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।















