আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতীয় বিজ্ঞানী ড. রোনাল্ডো লাইশরামের হাত ধরে বিশ্ব জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা। তাঁর নেতৃত্বে একদল আন্তর্জাতিক গবেষক আদি মহাবিশ্বে এক বিশাল গ্যালাক্সি সমষ্টি বা 'প্রোটোক্লাস্টার'-এর সন্ধান পেয়েছেন। মণিপুরের বিখ্যাত মিষ্টি জলের হ্রদ 'লোকতাক'-এর নামানুসারে এই মহাজাগতিক কাঠামোর আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয়েছে। নাম রাখা হয়েছে 'লোকতাক প্রোটোক্লাস্টার'। বিজ্ঞানীরা এটিকে মহাকর্ষ বলের দ্বারা গড়ে ওঠা এক আদিম 'গ্যালাক্সির শহর' হিসাবে বর্ণনা করেছেন। বিখ্যাত জার্নাল 'দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স'-এ এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।
মণিপুরের থৌবাল জেলার খাংগাবোকের বাসিন্দা ড. রোনাল্ডো লাইশরাম। বর্তমানে জাপানের ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরি বা নাওজের একজন গবেষক। তাঁর পরিচালিত এই গবেষণাকাজে মহাবিশ্বের এক প্রাচীন ইতিহাস সামনে এসেছে। প্রয়াত লাইশরাম মহাজন সিং এবং লাইশরাম সানাহানবি দেবীর কনিষ্ঠ পুত্র রোনাল্ডো। মহাকাশের প্রতি তাঁর ভালবাসা শুরু সেই ছোট থেকেই। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তিনি একটি গ্রহাণু বা অ্যাস্টেরয়েড আবিষ্কার করে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এ পি জে আব্দুল কালামের হাত থেকে সংবর্ধনা পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি জাপানের তোহুকু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে মাস্টার্স এবং পিএইচডি করেন।
গবেষণার পাশাপাশি তিনি মণিপুরের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনা প্রসারের জন্যও কাজ করছেন। তিনি 'মণিপুর অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি'-এর প্রতিষ্ঠাতা ও কো-অর্ডিনেটর। এ ছাড়া, অন্য দু'টি শিক্ষা সংস্থার সঙ্গেও যুক্ত।
তাঁর গবেষণায় জানা গিয়েছে, এই লোকতাক প্রোটোক্লাস্টারটিকে আজ থেকে ১২.৬ বিলিয়ন বছর আগের অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। সেই সময়ে আমাদের মহাবিশ্বের বয়স ছিল মাত্র ১.২ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ, এই গ্যালাক্সিগুলি মহাবিশ্ব সৃষ্টির একেবারে গোড়ার দিকে তৈরি হয়েছিল।
গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা জাপানের 'সুবারু টেলিস্কোপ' এবং নাসার 'জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ'-এর তথ্য ব্যবহার করেছেন। দেখা গিয়েছে, অপেক্ষাকৃত নতুন মহাবিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার গ্যালাক্সিগুলি শান্ত এলাকার গ্যালাক্সির তুলনায় অনেক দ্রুত এবং ভিন্নভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অর্থাৎ, একটি গ্যালাক্সি কোথায় অবস্থিত, তা তার বেড়ে ওঠাকে প্রভাবিত করে।
তবে হঠাৎ এমন নামকরণ কেন? পৃথিবীর প্রাকৃতিক ঐতিহ্য এবং গভীর মহাকাশের মধ্যে এক অদ্ভুত সেতুবন্ধন তৈরি করেছে এই নাম। মণিপুরের লোকতাক হ্রদ তার ভাসমান দ্বীপ বা 'ফুমদি'-র জন্য বিশ্বখ্যাত, যা একটি একক জলভাগের মধ্যে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ঠিক একইভাবে, মহাকাশে আবিষ্কৃত এই নতুন কাঠামোটিতে চারটি বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্র রয়েছে, যা একটি বিশাল এবং বিবর্তনশীল সিস্টেমের অংশ হিসেবে নিজেদের মধ্যে সংযুক্ত।
এ বিষয়ে ড. রোনাল্ডো লাইশরাম সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন "লোকতাক হ্রদ মণিপুরের পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই আবিষ্কারের নাম লোকতাক রাখা আমার জন্মভূমিকে এই বিশাল মহাবিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্রয়াস। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের ইতিহাসে লোকতাক নামটি চিরকাল প্রতিধ্বনিত হবে।"
মহাকাশ গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার শুধুমাত্র বিজ্ঞানের অগ্রগতিই নয়, বরং উত্তর-পূর্ব ভারতসহ সমগ্র দেশের ছাত্রছাত্রীদের অনুপ্রাণিত করবে। মণিপুরের ভাসমান হ্রদ থেকে শুরু করে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সির শহর— 'লোকতাক' নামটির পরিধি এবার বিস্তৃত হল অনন্ত মহাবিশ্বে।















