আজকাল ওয়েবডেস্ক: এক সময় সকাল থেকে রাত—গাড়িতে, বাসে, অফিসে কিংবা বাড়িতে মানুষের নিত্যসঙ্গী ছিল এফএম রেডিও। প্রিয় আরজে-র কণ্ঠ, জনপ্রিয় বলিউড গান, শহরের খবর এবং প্রাণবন্ত অনুষ্ঠান তরুণ প্রজন্মের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই জনপ্রিয় মাধ্যম এখন বড় সংকটের মুখে। দেশের একাধিক বেসরকারি এফএম রেডিও স্টেশন ইতিমধ্যেই সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে, যা এফএম শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তাই প্রশ্ন উঠছে এবার মহালয়াতে এফএম রেডিওতে ‘বাজলো তোমার আলোর বেনু’ শোনা যাবে তো? নাকি হারিয়ে যাবেন বাঙালির ঐতিহ্য বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।
সম্প্রতি এইচটি মিডিয়ার রেডিও নাশা, রেডিওওয়ান এবং চেন্নাইয়ের ফিভার ৯১.৯ এফএম সম্প্রচার বন্ধ করেছে। এর আগে টিভি টুডে তাদের ইশক ১০৪.৮ এফএম বন্ধ করে দেয় এবং রেড এফএম মুম্বইয়ের ম্যাজিক এফএম-এর লাইসেন্সও ফেরত দিয়েছিল। যদিও ফিভার এফএম-এর মূল ১০৪.০ নেটওয়ার্ক এখনও কিছু শহরে চালু রয়েছে।
কেন বন্ধ হচ্ছে এফএম স্টেশন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বন্ধ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ১৫ বছরের ফেজ-৩ লাইসেন্সের বিপুল খরচ। বহু বছর আগে বেসরকারি সংস্থাগুলি বিজ্ঞাপনের আয় দ্রুত বাড়বে ধরে নিয়ে উচ্চমূল্যে স্পেকট্রাম লাইসেন্স কিনেছিল। কিন্তু বাস্তবে বিজ্ঞাপনের বাজার সেই হারে বাড়েনি। ফলে প্রতিবছর নির্দিষ্ট পরিমাণ লাইসেন্স ফি পরিশোধ করা এখন অনেক সংস্থার পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর পাশাপাশি গান সম্প্রচারের জন্য কপিরাইট ফি, টাওয়ার ভাড়া, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং অন্যান্য স্থায়ী খরচও ক্রমশ বেড়েছে। বিজ্ঞাপন কমলেও এই খরচ কমে না, ফলে লোকসানের বোঝা বাড়তেই থাকে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বড় চ্যালেঞ্জ
একসময় টেলিভিশন ছিল এফএম রেডিওর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। Spotify, JioSaavn, Gaana, YouTube Music, পডকাস্ট এবং অডিওবুক প্ল্যাটফর্ম মানুষের শোনার অভ্যাস বদলে দিয়েছে। এখন শ্রোতারা নিজেদের পছন্দমতো গান বা অনুষ্ঠান যখন খুশি শুনতে পারেন। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে রেডিও শোনার প্রবণতা অনেকটাই কমে গেছে।
এফএম রেডিওর সোনালি অধ্যায়
ভারতে ১৯৭৭ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও প্রথম এফএম সম্প্রচার শুরু করে। পরে ২০০১ সালে রেডিও সিটি বেঙ্গালুরু দেশের প্রথম সম্পূর্ণ বেসরকারি এফএম স্টেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এরপর রেডিও মির্চি, রেড এফএম, ফিভার এফএমসহ একাধিক স্টেশন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০০৫ সালের পর এফএম রেডিও শহুরে জীবনের অন্যতম প্রধান বিনোদন মাধ্যম হয়ে ওঠে এবং বহু রেডিও জকি তারকাখ্যাতি অর্জন করেন।
ভবিষ্যৎ কী?
রেডিও শিল্পের দাবি, সরকার যদি কিছু নীতিগত পরিবর্তন আনে, তাহলে এই খাত নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। শিল্পমহল চায় রেডিওকে সংবাদ সম্প্রচারের অনুমতি দেওয়া হোক, জিএসটি ১৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হোক এবং পুরনো লাইসেন্স ফি কাঠামোর পরিবর্তে আয়ের ভিত্তিতে ফি নির্ধারণ করা হোক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে শুধু রেডিও সম্প্রচার করলেই চলবে না। এফএম সংস্থাগুলিকে পডকাস্ট, সোশ্যাল মিডিয়া, ডিজিটাল ভিডিও, লাইভ ইভেন্ট এবং মিউজিক ফেস্টিভ্যাল-এর মতো নতুন ক্ষেত্রেও নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। আরজেদেরও শুধু রেডিওর কণ্ঠস্বর নয়, বরং ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সময়ের সঙ্গে যারা নিজেদের বদলাতে পারবে, তারাই আগামী দিনে টিকে থাকবে।
















