আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিধানসভা বা বিধান পরিষদ, কোনওটারই সদস্য নন তিনি৷ অথচ মন্ত্রী হিসাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ছয় মাসেরও বেশি!  এবার বিহার পঞ্চায়েত মন্ত্রী দীপক প্রকাশের মন্ত্রিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্টে। এই নিয়ে এক সমাজকর্মীর জনস্বার্থ মামলার প্রক্ষিতে বিহার সরকারের থেকে জবাব চেয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত। এই মামলা জরুরি শুনানির জন্য আগামী ৪ আগস্ট তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেছেন, "এটা সম্পূর্ণভাবে একটা আইনি বিষয়। কোনও নির্বাচনে জয়ী না হয়েও কীভাবে একজন মন্ত্রী ছয় মাসের বেশি সময় ধরে পদে বহাল রয়েছেন, তা রাজ্য সরকারকে ব্যাখ্যা করতে হবে।"

মামলার প্রেক্ষাপট
নির্বাচনে জয়ী না হয়েও বিহারের পঞ্চায়েত মন্ত্রী দীপক প্রকাশের পদে বহাল থাকাকে কেন্দ্র করেই আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। 

মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার গত ১৫ এপ্রিল (২০২৬) পদত্যাগ করেন। ততদিন পর্যন্ত নীতীশ মন্ত্রিসভায় দীপক প্রকাশের মন্ত্রীত্বের সময়সীমা ছিল চার মাস ২৬ দিন। নীতীশ কুমার ইস্তফা দিতেই প্রকাশের মন্ত্রীত্বেরও অবসান ঘটে। পরবর্তী ২২ দিন তিনি কোনও মন্ত্রী পদে ছিলেন না।

এরপর ৭ মে (২০২৬) সম্রাট চৌধুরী বিহারে নতুন সরকার গঠন করেন। সেখানেও ঠাঁই হয় প্রকাশের। নির্বাচনে জয়ী না হওয়া সত্ত্বেও দীপক প্রকাশকে ফের মন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করানো হয়।

এরপরই ৩০ মে (২০২৬) দীপক প্রকাশে মন্ত্রিত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়। আবেদনে, দীপকের মন্ত্রিত্ব পদে নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে দীপক প্রকাশ "সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা" করেছেন।

উল্লেখ্য, সংসদ বা বিধানসভা অথবা বিধান পরিষদে নির্বাচিত না হয়েও প্রকাশ এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে মন্ত্রী পদে রয়েছেন।

আইন কী বলে?
সংবিধানের ১৬৪(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারা নিযুক্ত কোনও মন্ত্রীকে নির্বাচিত হওয়ার জন্য ছয় মাসের একটি সময়সীমা (গ্রেস পিরিয়ড) দেওয়া হয়। এতে বলা হয়েছে, "কোনও মন্ত্রী যদি টানা ছয় মাস রাজ্যের আইনসভার সদস্য না থাকেন, তবে সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি আর মন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না।" অর্থাৎ, ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচিত না হলে একজন মন্ত্রীকে অবশ্যই পদ ছাড়তে হবে।

বিহারের মামলাটি কেন আলাদা?
তবে দীপক প্রকাশের বিষয়টি কিছুটা ব্যতিক্রমী। কারণ তিনি একটানা ছয় মাস ধরে পদে থাকেননি।

নীতীশ কুমারের অধীনে তিনি চার মাস ২৬ দিন মন্ত্রী ছিলেন। যা ওই ছয় মাসের সময়সীমার মধ্যেই পড়েছিল। বর্তমান মেয়াদে মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর দ্বারা পুনরায় নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি মাত্র কয়েক মাস দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে সব মিলিয়ে হিসাব করলে, কোনও নির্বাচনে জয়ী না হয়েও তিনি ছয় মাসের বেশি সময় ধরে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই এই বিষয়টি বেশ কৌতূহলের।  

আইনসভার কোনও আসনের সদস্য না হয়েও মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই সংবিধানের ১৬৪(৪) অনুচ্ছেদের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে প্রচলিত রীতি হল, কোনও 'নিরাপদ আসন' -এর নির্বাচিত বিধায়ককে পদত্যাগ করান, যাতে ওই মন্ত্রী সেই আসনে উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।

অতীতের উদাহরণ
ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচিত হওয়ার শর্ত পূরণের জন্য অনেক সময় মন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীরা বিধান পরিষদের পথ বেছে নিয়েছেন। ২০১৯ সালে কোনও বিধায়ক না হয়েও উদ্ধব ঠাকরে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রাজ্যের বিধান পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।

উত্তরাখণ্ডে, ২০২১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া তীর্থ সিং রাওয়াত ছয় মাসের সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগেই পদত্যাগ করেছিলেন। কারণ কোভিড মহামারির কারণে সেখানে উপনির্বাচন আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

এমনকি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়াও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

মূল প্রশ্ন 
দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাস পর কোনও মন্ত্রীকে নির্বাচনে জয়ী করিয়ে আনার বিষয়টি কোনও বিতর্কের বিষয় নয়। কিন্তু একই মন্ত্রীর ক্ষেত্রে কি ছয় মাসের সেই বিশেষ সময়সীমার সুযোগ দু'বার নেওয়া যেতে পারে?

কোনও মন্ত্রীর পক্ষে কি ছয় মাসের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করা, কয়েক দিন পর ফের দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং দাবি করা যে নতুন করে শপথ গ্রহণের তারিখ থেকেই ছয় মাসের সময়সীমা আবার নতুন করে শুরু হবে- এমনটা করা কি আইনসম্মত?

আইনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অস্পষ্ট এই বিষয়টি 'দীপক প্রকাশ' মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্পষ্ট হবে।