আজকাল ওয়েবডেস্ক: ফলের রাজা আম। তীব্র তাপদাহ, অসহনীয় গরম সত্ত্বেও গ্রীষ্মের মরসুমে রেহাই মেলে একমাত্র রেহাই মেলে আমের স্বাদ পেয়েই। বৈশাখ- জ্যৈষ্ঠ মাস জুড়ে বাঙালির ঘরে ঘরে চলে আমের উৎসব। তবে ইদানীংকালে মুনাফাখোর অসাধু ব্যবসায়ীদের চক্করে বাজারে ফলের আকার দ্রুত বাড়াতে এবং কম সময়ে পাকানোর জন্য সাহায্য নেওয়া হয় রাসায়নিকের।
বাজারে বিক্রির জন্য এই ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করেন সিন্থেটিক গ্রোথ হরমোন। সেই আম খেয়েই শরীরে ঢোকে কৃত্রিম মারাত্মক বিষ।মানবদেহে প্রবেশ করেই এই কৃত্রিম রাসায়নিক নানারকম হরমোন নিঃসরণে বাধা সৃষ্টি করে। পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই রাসায়নিক মূলত এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর অর্থাৎ বাধাসৃষ্টিকারী হিসেবে কাজ করে। ফলে তা মানুষের প্রজননতন্ত্র ও থাইরয়েডের মতো গ্রন্থির মারাত্মক ক্ষতি করে।
দীর্ঘ মেয়াদে এই বিষাক্ত রাসায়নিক মানুষের লিভার, কিডনি ও মস্তিষ্ককেও অকেজো করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। আমকে দ্রুত পাকানোর জন্য আগে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত। এখনও অনেকক্ষেত্রেই এটি ব্যবহার করতে দেখা যায়।
ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (এফসা)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কার্বাইড জলের সংস্পর্শে এসে ক্ষতিকর অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি করে। যা মানুষের মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দেয়। যা মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট এবং চোখ ও ত্বকে তীব্র জ্বালাপোড়ার অনুভূতি তৈরি করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-র অধীনস্থ আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা আইআর্ক ফরমালিনকে ১-ক্যাটাগরির ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান বলে ঘোষণা করেছে। যা মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা আমের পচন রোধে ব্যবহার করে থাকেন। ফরমালিনযুক্ত আম মুখ, গলা ও পাকস্থলীতে তীব্র জ্বালাপোড়ার পাশাপাশি শ্বাসনালিরও ক্ষতি করে।
ইদানীং আমের ফলনে আবার কার্বাইডের বদলে ইথেফন ব্যবহার করা হচ্ছে। যার মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ পেটব্যথা, ডায়রিয়া ও বমির মতো সমস্যা তৈরি করে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, বর্তমান যুগে আম চাষের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, গাছে মুকুল ধরা থেকে ফল পাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার। ক্লোরপাইরিফস বা সাইপারমেথ্রিনের মতো কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ আমের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে স্নায়বিক সমস্যা ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। একাধিক গবেষণায় প্রকাশ, এর ফলে শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক ও বুদ্ধিমত্তার বা আইকিউ-এর বিকাশ ব্যাহত হয়।
বাজারের সব আমে রাসায়নিক না থাকলেও কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখে কৃত্রিমভাবে পাকানো আম সহজেই চেনা যায়। এসব আমের বাইরের অংশ সম্পূর্ণ গাঢ় হলুদ দেখালেও ভেতরের অংশটি কাঁচা থাকে। আমের ডাঁটির চারপাশটি কাঁচা থাকবে। কিন্তু বাকি অংশটি হলুদ দেখায়। কৃত্রিম আমের ত্বক বেশ চকচকে ধরনের হয়। কোনও মিষ্টি সুবাসও পাওয়া যায় না, যা প্রাকৃতিক ভাবে পাকানো আমে পাওয়া যায়।
কৃত্রিম ভাবে পাকানো আম থেকে নিজে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে বেশ কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। যেমন-
১। বাজার থেকে আম কেনার পর তা কলের জলে অন্তত ২-৩ মিনিট ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
২। এরপর পরিষ্কার জলে আরও ১৫-২০ মিনিট আম ভিজিয়ে রেখে খোসা ছাড়িয়ে খেতে হবে।
৩।বাজার থেকে মরসুমের শুরুতেই অতিরিক্ত হলুদ ও চকচকে আম কেনা উচিত না।
৪। আমের বোঁটার কাছে প্রাকৃতিকভাবে পাকানো আমের মিষ্টি সুবাস আছে কিনা, তা পরখ করে দেখে নিতে হবে।
৫। সাধারণত, কোনও বিশ্বাসযোগ্য বাগানমালিক, খাদ্য উৎপাদনকারী বা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে গাছপাকা আম কিনতে হবে।















