আজকাল ওয়েবডেস্ক: এবার লোকসভার দল ভাঙানোর খেলা রুখতে একেবারে কোমর বেঁধে নামল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। এআইটিসি সংসদীয় দলের পক্ষ থেকে লোকসভার স্পিকারের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিঠি পাঠিয়েছেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা তৃণমূল সংসদীয় দলের নেতা অভিষেক ব্যানার্জি। সংবাদমাধ্যমে বেশ কিছুদিন ধরেই গুঞ্জন ছড়াচ্ছিল যে, লোকসভায় তৃণমূলের কয়েকজন সাংসদ নাকি নিজেদের মূল দল থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী বা উপদল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সরাসরি স্পিকারের দরবারে কড়া আইনি বার্তা পাঠালেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ।
অভিষেক ব্যানার্জি তাঁর চিঠিতে অত্যন্ত স্পষ্ট এবং দৃঢ় ভাষায় মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তৃণমূল কংগ্রেস একটি অখণ্ড এবং অবিভাজ্য রাজনৈতিক দল। আইন অনুযায়ী, লোকসভার পরিষদীয় দল কখনই মূল রাজনৈতিক দলের বাইরে স্বাধীন কিছু নয়, বরং সেটি মূল দলেরই একটি অংশ মাত্র। তাই কয়েকজন সাংসদ নিজেদের ইচ্ছামতো দল থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা কোনও গোষ্ঠী তৈরি করতে পারেন না এবং সংসদের ভেতরে তেমন কোনও স্বতন্ত্র স্বীকৃতিও দাবি করতে পারেন না। দল ও দলের হুইপের সিদ্ধান্তই এখানে চূড়ান্ত।
এই দাবির সপক্ষে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনি নজিরও তুলে ধরেছেন তিনি। ২০২৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের 'সুভাষ দেশাই বনাম মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল' মামলার ঐতিহাসিক রায়ের কথা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়েছে, সংবিধানে এখন আর দল ভাঙার বা 'স্প্লিট'-এর কোনও আইনি ছাড়পত্র নেই। ২০০৩ সালের ৯১তম সংবিধান সংশোধনীর পর দশম তফসিল থেকে দল ভাঙার পুরোনো নিয়মটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কোনও রাজনৈতিক দল ভেঙে টুকরো হয়ে গেলে আইন তাকে কোনও বৈধতা দেয় না, বরং এমন পদক্ষেপকে সরাসরি দলত্যাগ বা পদ খারিজের অপরাধ হিসেবেই গণ্য করা হয়। সুপ্রিম কোর্টও পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, পরিষদীয় দলের চেয়ে মূল রাজনৈতিক দলই সবসময় সুপ্রিম বা সর্বোচ্চ।
চিঠিতে আরও একটি বড় আইনি প্যাঁচের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, দলত্যাগ বিরোধী আইন থেকে বাঁচতে হলে একমাত্র রাস্তা হলো কোনও দলের সম্পূর্ণ 'উইলয়' বা মার্জার (একত্রীকরণ)। কিন্তু তার জন্য দুটি শর্ত একসঙ্গে পূরণ হওয়া বাধ্যতামূলক— প্রথমত, মূল রাজনৈতিক দলটিকে অন্য দলের সাথে মিশে যেতে হবে এবং দ্বিতীয়ত, আইনসভার দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যকে সেই সিদ্ধান্ত সমর্থন করতে হবে। সংবাদমাধ্যমে যা রটেছে, তাতে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে শুধু সাংসদদের সংখ্যা থাকলেই বোধহয় আলাদা দল চেনা যায়, যা সম্পূর্ণ ভুল। যদি ধরেও নেওয়া হয় যে দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ দলবদল করছেন, তাও মূল রাজনৈতিক দল তো কারও সাথে মেশেনি, বা নতুন কোনও তৃণমূল কংগ্রেসও তৈরি হয়নি। তাই এই দুই শর্ত একসঙ্গে পূরণ না হলে, দলের হুইপ বা নেতৃত্বকে অমান্য করে আলাদা হওয়ার যেকোনও চেষ্টাই দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় পড়বে এবং তাঁদের সাংসদ পদ খারিজ হয়ে যাবে।
স্পিকারের নিজস্ব নির্দেশাবলীর ১২১ নম্বর ধারার কথা উল্লেখ করে অভিষেক জানিয়েছেন, লোকসভায় কোনও গোষ্ঠী বা দলকে স্বীকৃতি দেওয়ার নির্দিষ্ট নিয়ম ও সংখ্যার পরিমাপ রয়েছে, যেখানে দলের মূল নেতৃত্বের অবাধ্য হওয়া কোনও বিদ্রোহী উপদলকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনও স্থান নেই। সবশেষে লোকসভার স্পিকারের কাছে তৃণমূলের পক্ষ থেকে তিনটি স্পষ্ট অনুরোধ রাখা হয়েছে— প্রথমত, এই আইনি অবস্থানকে নথিবদ্ধ করা হোক; দ্বিতীয়ত, তৃণমূলকে একটি একক দল হিসেবেই দেখা হোক এবং কোনও বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে যেন কোনও রকম স্বীকৃতি বা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া না হয়; এবং তৃতীয়ত, এমন কোনও চিঠি যদি স্পিকারের কাছে এসেও থাকে, তবে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যেন অবশ্যই তৃণমূল কংগ্রেসকে নিজেদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে দলের নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দশম তফসিলে সাংসদ পদ খারিজের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকারও দল নিজেদের হাতে রাখছে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন অভিষেক।
















