ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস নিয়ে ছোটবেলা থেকেই বড়দের মুখে কত কথাই না আমরা শুনেছি। কিন্তু হিন্দু শাস্ত্র ও সনাতন ঐতিহ্যে ভোরের একটা বিশেষ সময়কে আলাদা করে ‘ব্রহ্ম মুহূর্ত’ বা ঈশ্বরের সময় বলা হয়েছে। সহজ কথায় বলতে গেলে, সূর্যোদয়ের ঠিক ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট আগের সময়টাই হলো ব্রহ্ম মুহূর্ত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কোনওদিন ভোর ৬টায় সূর্যোদয় হয়, তবে ৪টে ২৪ মিনিট থেকে ৫টা ১২ মিনিট পর্যন্ত সময়টুকুই হলো ব্রহ্ম মুহূর্ত। সনাতন সংস্কৃতিতে ‘ব্রহ্ম’ শব্দের অর্থ যেমন পরম সৃষ্টিকর্তা, তেমনই এর আরেক অর্থ পরম জ্ঞান। আর ‘মুহূর্ত’ মানে সময়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ। ঋষি-মুনিদের মতে, এই সময়টি আত্মিক উন্নতি ও জ্ঞান অর্জনের জন্য শ্রেষ্ঠ।
2
5
আধ্যাত্মিকতার এই ব্যাখ্যাকে যদি আমরা একপাশে সরিয়ে রেখে আধুনিক বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে এই প্রাচীন বিশ্বাসের পেছনে রয়েছে চমৎকার কিছু যুক্তি। ভোরবেলার এই সময়ে পুরো প্রকৃতি যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকে। চারপাশ শান্ত থাকায় বাতাসে ধুলোবালি ও দূষণের মাত্রা থাকে একবারে শূন্যের কোঠায়। বিজ্ঞানীরা বলেন, এই সময়ে বায়ুমণ্ডলে ‘ন্যাসেন্ট অক্সিজেন’ বা নবজাত অক্সিজেনের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি থাকে। এই ভীষণ বিশুদ্ধ অক্সিজেন যখন আমাদের শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে, তখন ফুসফুস চাঙ্গা হয়ে ওঠে, রক্ত পরিষ্কার হয় এবং শরীরের প্রতিটি কোষে এক নতুন এনার্জি বা জীবনীশক্তি ছড়িয়ে পড়ে।
3
5
চিকিৎসা বিজ্ঞানও এই ভোরের সময়টাকে মানুষের শরীরের জন্য দারুণ উপকারী বলে মনে করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রহ্ম মুহূর্তে আমাদের শরীরে স্ট্রেস বা মানসিক চাপ তৈরিকারী হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা সবচেয়ে কম থাকে। উল্টোদিকে মনকে শান্ত ও উৎফুল্ল রাখার হরমোনগুলো প্রাকৃতিকভাবেই শরীরের ভেতর একটা সুন্দর ভারসাম্য বজায় রাখে। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, এই সময়ে আমাদের মস্তিষ্ক থেকে সবচেয়ে বেশি ‘আলফা তরঙ্গ’ বা আলফা ওয়েভ তৈরি হয়। নিউরোলজিস্টদের মতে, আলফা তরঙ্গের প্রভাবে মানুষের মন গভীর শান্ত থাকে, সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং যেকোনও নতুন জিনিস শেখার বা মনে রাখার ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
4
5
আজকের ব্যস্ত জীবনে যারা শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী বা সৃজনশীল কাজের সাথে যুক্ত, তাদের জন্য ব্রহ্ম মুহূর্ত এক পরম আশীর্বাদ হতে পারে। দিনের অন্য সময়ে চারপাশে যে কোলাহল, গাড়ির হর্ন কিংবা মোবাইলের অনবরত নোটিফিকেশনের শব্দ থাকে, ভোরে তার কিছুই থাকে না। ফলে কোনও রকম মনোযোগ বিচ্যুতি ছাড়াই মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে প্রায় ২০০ শতাংশ বেশি থাকে। বলা হয়ে থাকে, এই শান্ত সময়ে মাত্র ১ ঘণ্টা মন দিয়ে পড়াশোনা বা কাজ করা, দিনের বেলার অন্য যেকোনও সময়ের ৪ ঘণ্টার খাটাখাটনির সমান ফল দিতে পারে।
5
5
প্রাচীন মুণি-ঋষিরা বিশ্বাস করতেন, এই সময়ে মহাবিশ্বের ইতিবাচক শক্তি বা কসমিক এনার্জি সবচেয়ে তীব্র আকারে প্রবাহিত হয়। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে, এই সময়ে মানুষের ভেতরের ‘ইগো’ বা অহংকার ঘুমিয়ে থাকে এবং অবচেতন মন বা সাবকনশাস মাইন্ড পুরোপুরি জাগ্রত হয়। তাই এই সময়ে দাঁড়িয়ে আপনি যা চিন্তা করবেন, নিজের জন্য যে লক্ষ্য স্থির করবেন বা যে প্রার্থনা করবেন, তা আপনার অবচেতন মনে খুব গভীর প্রভাব ফেলে। এই কারণেই ব্রহ্ম মুহূর্তে কিছুক্ষণ ধ্যান, যোগব্যায়াম কিংবা নিজের প্রিয় কোনও গঠনমূলক কাজ করলে শুধু যে মানসিক শান্তি মেলে তা-ই নয়, জীবনের সাফল্যের পথটাও অনেকখানি সহজ ও গোছানো হয়ে ওঠে।