একসময় কলকাতার লায়ন্স রেঞ্জ ছিল বাংলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। আজ মুম্বইয়ের দলাল স্ট্রিট যেমন ভারতের শেয়ার বাজারের প্রতীক, তেমনই একসময় পূর্ব ভারতের আর্থিক শক্তির প্রতীক ছিল কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জ।
2
12
জুট মিল, চা বাগান, শিপিং কোম্পানি এবং বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের ভাগ্য নির্ধারণ হত এই এক্সচেঞ্জের লেনদেনের মাধ্যমে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গৌরবময় ইতিহাস ম্লান হয়ে যায়। ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসের পর থেকে কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জে আর কোনও শেয়ার লেনদেন হয়নি।
3
12
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বহুদিন পর আবার আলোচনায় এসেছে এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান। প্রশ্ন উঠছে, একসময় এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্টক এক্সচেঞ্জ কেন কার্যত বন্ধ হয়ে গেল?
4
12
কলকাতায় শেয়ার ব্যবসার ইতিহাস শুরু হয় ১৮৩০ সালের দিকে। তখন কোনও স্থায়ী ভবন ছিল না। একটি নিমগাছের নিচে খোলা আকাশের তলায় দালালরা শেয়ার কেনাবেচা করতেন।
5
12
পরে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকলে ১৯০৮ সালের মে মাসে ‘Calcutta Stock Exchange Association’ আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়। শুরুতে সদস্য সংখ্যা ছিল ১৫০। ধীরে ধীরে এটি ভারতের অন্যতম প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ১৯৮০ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে স্থায়ী স্বীকৃতি লাভ করে সংস্থাটি।
6
12
একসময় কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জকে এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন এবং ভারতের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বৃহত্তম স্টক এক্সচেঞ্জ হিসেবে গণ্য করা হত। কিন্তু ২০০১ সালে ঘটে যাওয়া কেতন পারেখ কেলেঙ্কারি এই প্রতিষ্ঠানের পতনের সূচনা করে।
7
12
শেয়ার ব্রোকার কেতন পারেখ এবং তাঁর সহযোগীরা কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত একাধিক শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে বাজারে কারসাজি করেছিলেন। এই ঘটনার ফলে পেমেন্ট সংকট তৈরি হয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে এক্সচেঞ্জের পরিচালন ব্যবস্থা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও প্রকাশ্যে আসে।
8
12
এরপর থেকে কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জ আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। ২০০৫ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে এর দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়।
9
12
বিনিয়োগকারী এবং তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলি ধীরে ধীরে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ এবং বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। কারণ এই দুই এক্সচেঞ্জ দ্রুত আধুনিক ইলেকট্রনিক ট্রেডিং ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং সারা দেশে তাদের উপস্থিতি বিস্তার করে।
10
12
শেষ আঘাত আসে ২০১৩ সালে। সেবি কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের C-STAR ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে লেনদেন স্থগিত করে। কারণ এক্সচেঞ্জটি একটি ক্লিয়ারিং কর্পোরেশন গঠন করতে বা কোনও ক্লিয়ারিং কর্পোরেশনের সঙ্গে যুক্ত হতে ব্যর্থ হয়েছিল। এই কাঠামো ছাড়া শেয়ার লেনদেনের নিষ্পত্তি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। সেবি অতিরিক্ত সময় দিতে অস্বীকার করলে লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
11
12
শুধু কলকাতা নয়, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সেবির নীতির ফলে দেশের ১৭টি আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধ হয়ে যায়। বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, মাদ্রাজ, পুনে, জয়পুরসহ একাধিক শহরের স্টক এক্সচেঞ্জও ইতিহাসে পরিণত হয়। ফলে ভারতের শেয়ার বাজার কার্যত মুম্বইকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে।
12
12
আজ পশ্চিমবঙ্গ সরকার কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগের কথা বলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী বাজার কাঠামো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার না করলে এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না।