আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা, ঠান্ডা হাওয়া আর তার সাথেই জঙ্গল কিংবা বাগানের এক কোণ থেকে ভেসে আসা ময়ূরের ডাক— বর্ষার এই পরিবেশ কার না চেনা! আর এই মরশুমের সবচেয়ে মোহময়ী দৃশ্য হল পুরুষ ময়ূরের পেখম মেলে সেই রাজকীয় নৃত্য।
2
8
যুগ যুগ ধরে মানুষ বিশ্বাস করে আসছে, বৃষ্টির আনন্দেই বুঝি ময়ূর পেখম তুলে নাচে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। রোমান্টিক এই ধারণার পেছনে আসলে লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম এবং হরমোনের খেলা।আসুন জেনে নেওয়া যাক, মেঘ ডাকলেই ময়ূরের পেখম মেলার আসল বৈজ্ঞানিক কারণটি ঠিক কী?
3
8
১. বৃষ্টির আনন্দ নয়, এটি আসলে ‘প্রেমের মরশুম’
বর্ষার আগমন আর ময়ূর-ময়ূরীর প্রজনন ঋতু হুবহু একই সময়ে ঘটে। জুন-জুলাই মাসের বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ ময়ূরের শরীরে ব্যাপক হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে। এই সময়ে তারা সঙ্গিনী অর্থাৎ ময়ূরীকে আকর্ষণ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মেঘলা আবহাওয়া এবং ঠান্ডা বাতাস এদের আরও বেশি সক্রিয় করে তোলে। তাই মেঘ দেখলেই এরা নাচ শুরু করে, যা আসলে মিলনের ডাক।
4
8
২. ২০০ পালকের ‘প্রেমের নাচ’
বিজ্ঞানীদের ভাষায় ময়ূরের এই নাচকে বলা হয় ‘কোর্টশিপ ডিসপ্লে’ বা প্রণয় নৃত্য। একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ ময়ূরের লেজে প্রায় ২০০টিরও বেশি চোখ ধাঁধানো রঙিন পালক থাকে। নাচের সময় ময়ূর তার এই বিশাল পেখমটিকে হাতপাখার মতো মেলে ধরে এবং এক অদ্ভুত কম্পন তৈরি করে। এই কম্পনের ফলে পালক থেকে এক ধরণের মৃদু শব্দ এবং চাক্ষুষ সংকেত তৈরি হয়, যা দেখে আকৃষ্ট হয় ময়ূরীরা।
5
8
যোগ্যতমের জয়: ময়ূরীরা সাধারণত সেই পুরুষ ময়ূরকেই সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়, যার পেখম সবচেয়ে বড়, উজ্জ্বল এবং নাচের মুদ্রা সবচেয়ে নিখুঁত। কারণ উজ্জ্বল ও সুস্থ পালক মানেই সেই ময়ূরটি শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও বংশবিস্তারের জন্য সবচেয়ে যোগ্য।
6
8
ময়ূরের চোখের জলে কি সন্তান হয়?
ময়ূরকে নিয়ে সমাজে নানাবিধ পৌরাণিক রূপকথা ও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হল— নাচের পর ময়ূর নাকি কাঁদে এবং সেই চোখের জল খেয়ে ময়ূরী গর্ভবতী হয়!
বিজ্ঞানীরা এই তথ্যটিকে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও ‘ভ্রান্ত ধারণা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। নাচের সময় ময়ূর যে তীব্র কর্কশ আওয়াজ করে, দূর থেকে অনেকে সেটাকে কান্না মনে করেন। আসলে আর পাঁচটা সাধারণ পাখির মতোই ময়ূর-ময়ূরীও অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক উপায়েই বংশবৃদ্ধি করে। এর সঙ্গে চোখের জলের দূরদূরান্তের কোনও সম্পর্ক নেই।
7
8
গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে মুক্তি:
যৌন তাড়না ছাড়াও, তীব্র গরমের পর বর্ষার ঠান্ডা আবহাওয়া ময়ূরদের শরীরকে আরাম দেয়। তাপমাত্রা কমে যাওয়ার কারণে এদের শক্তির মাত্রা একলাফে অনেক বেড়ে যায়। ফলে এরা অনেক বেশি চঞ্চল ও চনমনে হয়ে ওঠে, যা ওদের মেঘ আসার আগে বা বৃষ্টির সময় নাচতে বাধ্য করে।
8
8
মরশুম শেষে পালক ঝরে যাওয়া
বর্ষা এবং মিলনের এই মরশুমটি আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসের দিকে শেষ হতেই ময়ূরের শরীর থেকে এই সুন্দর লম্বা রঙিন পালকগুলো খসে পড়তে শুরু করে। প্রকৃতির এই স্বাভাবিক নিয়মকে বলা হয় ‘মোল্টিং’। পরবর্তী কয়েক মাস ধরে আবার নতুন করে পালক গজাতে শুরু করে, যাতে আগামী বছরের বর্ষায় তারা আবারও নতুন সাজে ময়ূরীদের মন জয় করতে তৈরি হতে