SIR আতঙ্ক: ঠিক কাদের নাম বাদ পড়তে পারে বাংলায়? তীব্র জটিলতা সুপ্রিম কোর্টে
- 1
- 13
দেশের একাধিক রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে শুরু হওয়া বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) ঘিরে একের পর এক জনস্বার্থ মামলা নিয়ে এই সপ্তাহে শুনানি চালাচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট। এই শুনানিগুলিতে বারবার উঠে আসছে নাগরিকত্বের প্রশ্ন, অত্যন্ত সীমিত সময়সীমা এবং এমন একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য পরিণতি, যার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারেন—এই আশঙ্কা।
- 2
- 13
এই শুনানির মধ্যেই নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম Reporters’ Collective-এর একটি প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশন যে বক্তব্য দিয়েছে—তার বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বা তথাকথিত তথ্যগত অসঙ্গতির অভিযোগে যে নোটিসগুলি পাঠানো হচ্ছে, তার বড় অংশই কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত, পরীক্ষিত নয় এমন অ্যালগরিদমের মাধ্যমে গণহারে তৈরি। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যারের দ্বারা ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত হাজার হাজার মামলার ক্ষেত্রে জেলা স্তরের ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক নোটিস খতিয়ে দেখতে বাধ্য করা হয়েছে। বাস্তবে, এত অল্প সময়ে প্রতিটি মামলার আলাদা করে যাচাই সম্ভব না হওয়ায়, তাঁরা কার্যত কোনও বিকল্প না পেয়ে দু’সপ্তাহের মধ্যে লক্ষাধিক নোটিসে সই করতে বাধ্য হয়েছেন।
- 3
- 13
এই প্রেক্ষাপটে SIR-এর যৌক্তিকতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারীদের পক্ষে সওয়াল করা প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিবাল। কেরালা, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলগুলির হয়ে হাজির হয়ে তিনি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির বেঞ্চকে প্রশ্ন করেন—বার্ষিক ভোটার তালিকা যাচাই করার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে গোটা দেশজুড়ে SIR চালানোর প্রয়োজন কেন দেখা দিল, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কি কোনও তথ্য বা পরিসংখ্যান আদালতে পেশ করেছে?
- 4
- 13
দ্য হিন্দু-র রিপোর্ট অনুযায়ী, সিবাল বলেন, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল সুস্পষ্ট তথ্য ও বিশদ সমীক্ষার ভিত্তিতে আদালতকে বোঝানো যে কেন এই মুহূর্তে SIR অপরিহার্য। “এই ধরনের একটি প্রক্রিয়ায় অবশ্যই মনোযোগ দিয়ে ভেবে দেখার প্রয়োজন, কেন আজ হঠাৎ করে এটি জরুরি হয়ে পড়ল। শুধু কোনও নির্দিষ্ট এলাকা বা কেন্দ্র নয়, কেন গোটা দেশের ক্ষেত্রেই এই সিদ্ধান্ত?”—বেঞ্চের সামনে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
- 5
- 13
এর জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, নির্বাচন কমিশন কেবলমাত্র সেই ভোটারদের কাছেই নথি চাইছে, যাঁরা নিজেদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে যুক্ত করতে পারছেন না। কিন্তু সিবাল পাল্টা প্রশ্ন তোলেন—দেশের কত মানুষই বা তাঁদের বাবা-মায়ের জন্মসনদ, এমনকি নিজের জন্মসনদ হাতে রাখতে পারেন? তাঁর বক্তব্য, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্যত ১ কোটি ৮২ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
- 6
- 13
সিবাল আরও জানতে চান, বিহারে সদ্য সমাপ্ত SIR-এর পর সেখানে ঠিক কতজন অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিত হয়েছেন। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি যখন মৃত্যুহার ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের কথা তুলে ধরেন এবং প্রধান বিচারপতি বলেন যে ২০০২ সালের পর ভোটার তালিকায় অনেক পরিবর্তন হওয়াই স্বাভাবিক, তখন সিবাল জোর দিয়ে বলেন—এই সব পরিবর্তন তো ইতিমধ্যেই বার্ষিক সংশোধনের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা থাকা সত্ত্বেও ঠিক কী তথ্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিল যে, নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে ‘হোলসেল’ SIR অপরিহার্য?
- 7
- 13
এই শুনানিতে নাগরিক অধিকারের দিকটি তুলে ধরেন এনজিও অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস-এর পক্ষে উপস্থিত প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শংকরনারায়ণন। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ার ফলে মানুষ এক ধরনের স্থায়ী আতঙ্কে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন—যে কোনও মুহূর্তে ‘বিদেশি’ তকমা দিয়ে তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ICE অভিযানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আজ না হোক, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এখানেও তৈরি হতে পারে। “এই ছোট্ট কাগজটাই আমাদের নাগরিক অধিকার, আমাদের সুরক্ষা এবং এই দেশের অংশ হয়ে থাকার অধিকার নিশ্চিত করে,” মন্তব্য করেন তিনি।
- 8
- 13
এই আবহেই আধার কার্ডকে পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রশ্নে আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য সামনে এসেছে। দ্য হিন্দু-র রিপোর্ট অনুযায়ী, বিজেপি নেতা অশ্বিনী কুমার উপাধ্যায়ের পক্ষে আইনজীবী বিজয় হংসারিয়া দাবি করেছিলেন, আধার সহজেই জাল করা যায়, তাই একে SIR-এর নথির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া উচিত। এর জবাবে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি বলেন, পাসপোর্টের মতো নথিও তো বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ইস্যু করা হয়। আধার একটি সরকারি নথি এবং যে কোনও নথিই জাল করা সম্ভব—এমনকি পাসপোর্টও। আধার নথিভুক্তিকরণের সময় বেসরকারি কেন্দ্রগুলি আসলে একটি সরকারি দায়িত্বই পালন করে।
- 9
- 13
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গ সংক্রান্ত নির্দেশ তামিলনাড়ুতেও প্রযোজ্য করার দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন ডিএমকে নেতা আর.এস. ভারতী। তাঁর পক্ষে সওয়াল করে কপিল সিবাল আদালতকে অনুরোধ করেন, যাঁদের ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’র অভিযোগে নোটিস পাঠানো হয়েছে, তাঁদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করার নির্দেশ যেন তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রেও কার্যকর করা হয়। লাইভ ল-এর খবর অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এই প্রস্তাবে আপত্তি তোলেননি এবং বলেন, একবার যদি বাংলার জন্য অভিন্ন নির্দেশিকা জারি হয়, তা তামিলনাড়ুতেও প্রযোজ্য হতে বাধা নেই।
- 10
- 13
উল্লেখযোগ্যভাবে, তামিলনাড়ুতে দাবি ও আপত্তি জানানোর শেষ তারিখ ৩০ জানুয়ারি। আদালত এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের জবাব চেয়েছে। দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, সিবাল বেঞ্চকে জানান, মোট ১৮ লক্ষ মানুষের জন্য নোটিস জারি করা হলেও প্রায় ৮৮ শতাংশ মানুষ এখনও কোনও নোটিস পাননি, অথচ পুরো প্রক্রিয়ার সময়সীমা শেষ হতে চলেছে।
- 11
- 13
এর আগের দিন, ২৭ জানুয়ারি, নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জানায় যে ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও প্রত্যেক নাগরিককে সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে ভারতীয় নাগরিকত্বের শর্ত পূরণ করে যেতে হবে। কমিশনের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী মনিন্দর সিং বলেন, ভোটার তালিকায় একবার নাম উঠলেই আজীবন থাকার অধিকার তৈরি হয় না।
- 12
- 13
যদিও কমিশনের আরেক আইনজীবী দামা সেশাধ্রি নাইডু দাবি করেন, নাগরিকত্ব যাচাই এবং নাগরিকত্ব নির্ধারণ—এই দুই প্রক্রিয়া এক নয় এবং বিহারে SIR নিয়ে একটি অভিযোগও জমা পড়েনি। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসা অভিজ্ঞতা এই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না বলেই মনে করছেন আবেদনকারীরা।
- 13
- 13
