মহাকাশ ভ্রমণ শুনতে যতটা রোমাঞ্চকর, বাস্তবে তা ততটাই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন মহাকাশে থেকে গবেষণা করা মানে শুধু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ নয়, মানবদেহের সহনশীলতারও পরীক্ষা। আজ নারী-পুরুষ উভয়েই মহাকাশচারী হিসেবে কাজ করছেন। তবে একটি বিষয় নিয়ে বিশেষভাবে সতর্ক মার্কিন মহাকাশ সংস্থা NASA—মহাকাশে যেন কোনও নারী মহাকাশচারী গর্ভবতী না হন। মিশনের সময় ব্যক্তিগত শারীরিক সম্পর্ক নিরুৎসাহিত করা হয়, কারণ অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ পুরো অভিযানের নিরাপত্তা ও সাফল্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
2
5
প্রশ্ন উঠতেই পারে, মহাকাশে গর্ভধারণ কি আদৌ সম্ভব? মহাকাশ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, জৈবিক দিক থেকে তা অসম্ভব নয়। কীটপতঙ্গসহ কিছু ক্ষুদ্র প্রাণীর ওপর মহাকাশে প্রজনন সংক্রান্ত পরীক্ষা সফল হয়েছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে বা বড় প্রাণীর ক্ষেত্রে এমন পরীক্ষা হয়নি। ফলে ভ্রূণের বৃদ্ধি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন বা জন্ম-পরবর্তী স্বাস্থ্যের ওপর মহাকাশ পরিবেশের প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই।
3
5
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা দুটি—মহাজাগতিক বিকিরণ ও মাইক্রোগ্রাভিটি। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বকক্ষেত্র আমাদের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে রক্ষা করে, কিন্তু মহাকাশে সেই সুরক্ষা নেই। উচ্চমাত্রার কসমিক রেডিয়েশন ভ্রূণের কোষ বিভাজনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, জিনগত ত্রুটি তৈরি করতে পারে, এমনকি গর্ভপাতের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে শূন্য-মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে শরীরের রক্ত ও তরল উপরের দিকে সরে যায়, পেশি ও হাড় দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি মিশনে থাকা মহাকাশচারীদের মধ্যে পেশির ভর কমে যাওয়া, হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার মতো সমস্যা দেখা গেছে। এই পরিস্থিতিতে গর্ভধারণ হলে মা ও ভ্রূণ—দু’জনের জন্যই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
4
5
আরেকটি দিক নিয়েও সাধারণ মানুষের কৌতূহল প্রবল—মহাকাশে যৌনতা। বাস্তবতা অবশ্য কল্পনার মতো সহজ নয়। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কৌশলীরা জানিয়েছেন, মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় শরীর ভেসে যায়, ফলে স্বাভাবিক শারীরিক সংযোগ বজায় রাখা কঠিন। সামান্য ধাক্কায় দু’জন আলাদা দিকে সরে যেতে পারেন। স্থির অবস্থান বজায় রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা দরকার হয়। ফলে বিষয়টি যতটা রোম্যান্টিক কল্পনায় শোনায়, বাস্তবে তা অত্যন্ত জটিল।
5
5
সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাকাশ এখনও মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ নয়। বিশেষ করে গর্ভধারণের মতো সূক্ষ্ম ও জটিল জৈব প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি। ভবিষ্যতে যদি চাঁদ বা মঙ্গলগ্রহে স্থায়ী মানব বসতি গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে মানব প্রজনন ও শিশুর বিকাশ নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা অপরিহার্য। তার আগে মহাকাশে গর্ভধারণ কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বিষয় নয়, বরং গভীর উদ্বেগেরও কারণ।