১৯৮০ সালের পর প্রথম, তাসের ঘরের মতো পতন সোনার দামে! এক্ষুনি ছুটুন নিকটবর্তী দোকানে....
- 1
- 12
ভারতীয় বাজারে সোনা ও রুপোর দামে আচমকা এবং তীব্র পতন কার্যত চমকে দিয়েছে বিনিয়োগকারী ও সাধারণ ক্রেতাদের। কারণ, এর ঠিক আগের দিনই এই দুই মূল্যবান ধাতু সর্বকালীন বেশি দামে পৌঁছেছিল। এক দিনের ব্যবধানে সোনার দাম প্রায় ৩.৫ শতাংশ এবং রুপোর দাম প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যায়।
- 2
- 12
মুম্বইয়ের বাজারে শুক্রবার ২৪ ক্যারাট সোনার দাম নেমে আসে প্রতি ১০ গ্রামে ১,৭৮,৮৬০ টাকায়, আর ২২ ক্যারাট সোনা বিক্রি হয় ১,৬৩,৯৬০ টাকা প্রতি ১০ গ্রামে। এই দামের সঙ্গে জিএসটি ও গয়না তৈরির মেকিং চার্জ যুক্ত নয়। অন্যদিকে স্পট মার্কেটে রুপোর দাম নেমে আসে প্রায় ৩,৮০,০০০ টাকা প্রতি কিলোগ্রামে। এই হঠাৎ ধস ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় তীব্র চর্চা। একাধিক পোস্টে দাবি করা হয়, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই সোনা ও রুপোর বাজার থেকে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ‘মুছে’ গেছে। অনেকেই একে ‘ম্যানিপুলেশন’ বা কৃত্রিমভাবে দাম নামানোর কৌশল বলে আখ্যা দেন।
- 3
- 12
এক ব্যবহারকারী এক্স-এ লেখেন, “মাত্র কয়েক মিনিটে সোনা ও রুপো বাজার থেকে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি উধাও। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লিকুইডিটি সুইং। এটা স্পষ্ট ম্যানিপুলেশন।” অন্য একজন মন্তব্য করেন, “এত দ্রুত ট্রিলিয়ন ডলার উধাও হওয়া মানে ভয়ংকর লিভারেজ ও লিকুইডিটি স্ট্রেস—স্বাভাবিক কিছু নয়।” এমনকি একটি অ্যাকাউন্ট দাবি করে, মাত্র ৩০ মিনিটে প্রায় ৫.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য নষ্ট হয়ে গেছে—যা যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সম্মিলিত জিডিপির সমান।
- 4
- 12
যদিও এই সব দাবির কোনও সরকারি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে এখনও নিশ্চিতকরণ নেই, তবে বাজারে এমন হঠাৎ ওঠানামা নিয়ন্ত্রকদের নজরে রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
- 5
- 12
এদিকে ইকোনমিক টাইমস-সহ বিভিন্ন আর্থিক সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত বাজার বিশ্লেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পতনের পিছনে মূলত কয়েকটি বাস্তব কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, ব্যাপক লাভ তুলে নেওয়ার প্রবণতা বা প্রফিট বুকিং। আগের দিনই এমসিএক্স-এ সোনার দাম প্রায় ১,৯৩,০৯৬ টাকা প্রতি ১০ গ্রামে পৌঁছেছিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ড ছুঁয়েছিল প্রায় ৫,৫৯৪ ডলার প্রতি আউন্স। এই রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছনোর পর বহু ট্রেডার দ্রুত লাভ ঘরে তুলতে বিক্রি শুরু করেন, যার ফলে এক ধরনের চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি হয়। এক দিনের মধ্যেই ২৪ ক্যারাট সোনার দাম প্রায় ৮২৩ টাকা প্রতি গ্রাম কমে যায়।
- 6
- 12
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী হওয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে জল্পনা বাজারে বিরূপ মনোভাব তৈরি করেছে। এর জেরে মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড বেড়েছে, ডলার শক্তিশালী হয়েছে এবং ডলারে দাম নির্ধারিত হওয়ায় সোনার আকর্ষণ তুলনামূলকভাবে কমেছে।
- 7
- 12
তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত সূচক বা টেকনিক্যাল ফ্যাক্টর। জানুয়ারি মাসেই সোনার দাম প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় বাজার স্পষ্টতই ‘ওভারবট’ অবস্থায় পৌঁছেছিল। রিলেটিভ স্ট্রেংথ ইনডেক্স (RSI) ৯০-এর ওপরে চলে যাওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী বুঝতে পারেন, দাম দীর্ঘমেয়াদী নয়। ফলে বিক্রির চাপ বাড়ে। পাশাপাশি ভারতের মতো দেশে এত বেশি দামে সাধারণ ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যায়। বেঙ্গালুরু-সহ বিভিন্ন শহরে ২২ ক্যারাট সোনার দাম নেমে এলেও তা ছিল প্রায় ১,৫৬,৪০০ টাকা প্রতি ১০ গ্রামে—যা এখনও অনেকের নাগালের বাইরে। কম চাহিদা (ফিজিক্যাল ডিমান্ড) এই সংশোধনকে আরও তীব্র করেছে।
- 8
- 12
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পতন কোনও বড় আর্থিক সংকেত নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি বুল মার্কেটের মধ্যেই এক ধরনের ‘স্বাস্থ্যকর সংশোধন’। সোনা ইতিমধ্যেই ১৯৮০-এর দশকের পর সেরা জানুয়ারি পারফরম্যান্স দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১,৬৫,০০০ টাকা প্রতি ১০ গ্রামের আশেপাশে শক্তিশালী সাপোর্ট রয়েছে। রুপোর ক্ষেত্রে পতন তুলনামূলক বেশি হলেও, মাসিক হিসাবে দুই ধাতুই এখনও যথেষ্ট উঁচু স্তরে রয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, কিছু সোনার ইটিএফ সাময়িকভাবে প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত সংশোধন দেখালেও পরে আংশিক ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
- 9
- 12
আগামী দিনে কী হতে পারে? বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, ফেব্রুয়ারি মাসে সোনার দাম আবারও শক্তিশালী থাকতে পারে। এমসিএক্স-এ বর্তমানে প্রায় ১,৬৯,৭২০ টাকা প্রতি ১০ গ্রামে লেনদেন হওয়া সোনা মাসের শেষে ২,২১,৫৯৯ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, অনুকূল পরিস্থিতিতে ২৬–৩০ শতাংশ পর্যন্ত ঊর্ধ্বগতি সম্ভব। এর প্রভাব সরাসরি পড়বে খুচরো বাজারে। মুম্বই ও বেঙ্গালুরুতে ফেব্রুয়ারির শুরুতেই ২৪ ক্যারাট সোনার দাম প্রতি গ্রামে ১৬,৫০০ থেকে ২০,০০০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে এবং মাসের শেষে তা ২২,০০০–২৩,০০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছনোর সম্ভাবনা রয়েছে।
- 10
- 12
এক্ষেত্রে মুদ্রা বাজারের গতিবিধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ডলারের তুলনায় রুপি প্রায় ৮৫.৫০-এর আশেপাশে থাকায় সোনার দামে চাপ তৈরি হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে মার্কিন সুদহার কমার সম্ভাবনা থাকলে ডলার দুর্বল হতে পারে, যা সোনাকে আবারও মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে আকর্ষণীয় করে তুলবে। দেশের বাজারে বিয়ের মরসুম ও অক্ষয় তৃতীয়ার প্রস্তুতিও চাহিদা বাড়াতে পারে। সাধারণত এই সময়ে জুয়েলাররা এমসিএক্স দামের তুলনায় ৫–১০ শতাংশ বেশি দামে সোনা বিক্রি করেন।
- 11
- 12
বিশ্বস্তরে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির ধারাবাহিক সোনা কেনা এবং শুল্ক ও বাণিজ্য যুদ্ধ ঘিরে অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদে সোনার পক্ষে সহায়ক হতে পারে। তবে ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, যদি সোনার দাম ১,৬৫,০০০ টাকা প্রতি ১০ গ্রামের নীচে নেমে যায়, তবে তা আরও পড়ে ১,৫০,০০০ টাকার স্তর পরীক্ষা করতে পারে—বিশেষ করে যদি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি প্রতিকূল থাকে।
- 12
- 12
