২০২৬ সালের শেষ দিকে বিশ্বের সমুদ্রগুলিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্কেত দেখা যাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো, রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি রয়েছে সমুদ্রের তাপমাত্রা।
2
16
একই সঙ্গে সমুদ্রের ক্ষুদ্র ও দ্রুত পরিবর্তনশীল স্রোতগুলিকে আরও নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন বিজ্ঞানীরা। এই ঘটনাগুলির প্রভাব শুধু সমুদ্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বৃষ্টিপাত, আঞ্চলিক তাপমাত্রা, চরম আবহাওয়া এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের উপরও পড়তে পারে এর প্রভাব।
3
16
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা গত ৮ অক্টোবর প্রকাশিত পূর্বাভাসে জানিয়েছে, এল নিনো আগামী ডিসেম্বরের দিকে সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছতে পারে। এই জলবায়ুগত পরিস্থিতি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আবহাওয়া ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
4
16
এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি জলবায়ুগত ঘটনা।
5
16
এটি এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন নামের বৃহত্তর জলবায়ু ব্যবস্থার একটি অংশ। এই ব্যবস্থায় এল নিনো, লা নিনা এবং নিরপেক্ষ পরিস্থিতি পর্যায়ক্রমে দেখা যায়।
6
16
সাধারণত বাণিজ্য বায়ু বা ট্রেড উইন্ডস উষ্ণ সমুদ্রের জলকে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনোর সময় এই বায়ুর শক্তি কমে যায়। ফলে উষ্ণ জল পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যে তাপের বণ্টন বদলে যায়।
7
16
এর ফলে কোথায় মেঘ তৈরি হবে, কোথায় বৃষ্টিপাত বাড়বে এবং কোথায় শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হবে, তার উপর প্রভাব পড়তে পারে। এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা-সহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঋতুভিত্তিক আবহাওয়ার ধরন বদলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
8
16
জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন ধ্বংস এবং মানুষের অন্যান্য কর্মকাণ্ডের ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে। এই গ্যাসগুলি পৃথিবীর তাপ আটকে রাখে। অতিরিক্ত তাপের বড় অংশই শোষণ করে সমুদ্র। ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে।
9
16
এল নিনো এই উষ্ণ পরিস্থিতিকে আরও প্রভাবিত করতে পারে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সামুদ্রিক প্রাণী ও প্রবালপ্রাচীরের ক্ষতি হতে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং কিছু অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার তীব্রতা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
10
16
WMO-র অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। উষ্ণ সমুদ্র থেকে বায়ুমণ্ডলে বেশি জলীয় বাষ্প প্রবেশ করলে অনুকূল পরিস্থিতিতে ভারী বৃষ্টিপাতের তীব্রতাও বাড়তে পারে।
11
16
এল নিনোর পাশাপাশি সমুদ্রবিজ্ঞানেও নতুন অগ্রগতি সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল নেচার জিওসায়েন্স পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণায় ‘জিওস্টেশনারি ওশান ফ্লো’ নামে একটি পদ্ধতির কথা জানানো হয়েছে।
12
16
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উপগ্রহ থেকে পাওয়া ধারাবাহিক তাপীয় ছবি ব্যবহার করে সমুদ্রপৃষ্ঠের স্রোত আরও সূক্ষ্মভাবে চিহ্নিত করা যায় এই পদ্ধতিতে।
13
16
আটলান্টিক মহাসাগরের গালফ স্ট্রিমে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের ক্ষুদ্র পরিসরের সঞ্চালনের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন, যা আগে মূলত উচ্চ রেজোলিউশনের কম্পিউটার মডেলে দেখা যেত।
14
16
এই ক্ষুদ্র স্রোতগুলি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যেতে পারে। সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে গভীর স্তরে তাপ, পুষ্টি ও কার্বনের আদানপ্রদানে এগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সামুদ্রিক দূষণ কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তা বুঝতেও এই প্রযুক্তি সাহায্য করতে পারে।
15
16
সমুদ্রস্রোত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাপ ছড়িয়ে দেয় এবং বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ক্রমাগত আদানপ্রদান চালায়। তাই এই স্রোতগুলিকে আরও নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারলে জলবায়ু মডেলের অনিশ্চয়তা কমানো, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র বোঝা এবং দূষণ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে।
16
16
তবে গবেষণাটি এল নিনোর কারণে সমুদ্রস্রোতের নতুন কোনও পরিবর্তন ঘটেছে, এমন প্রমাণ দেয়নি। এর মূল গুরুত্ব হল, সমুদ্রের ক্ষুদ্র ও দ্রুত পরিবর্তনশীল স্রোত পর্যবেক্ষণের জন্য বিজ্ঞানীদের হাতে আরও উন্নত একটি পদ্ধতি তুলে দেওয়া।