বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে দুর্গাপুজো অন্যতম বড় উৎসব। আর এই উৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে মহালয়া। ভোরের অন্ধকারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনা, চণ্ডীপাঠের সুরে দেবী দুর্গার আরাধনা এবং গঙ্গার ঘাটে তর্পণ—সব মিলিয়ে মহালয়া বাঙালির আবেগ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
2
10
২০২৬ সালে মহালয়া পালিত হচ্ছে ১০ অক্টোবর, শনিবার। এই দিনেই পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে এবং দেবীপক্ষের সূচনা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, দুর্গাপুজোর মূল আচার শুরু হয় মহাষষ্ঠী থেকে, তা হলে মহালয়াকেই কেন পুজোর সূচনা বলে মনে করা হয়? এই দিনের ধর্মীয় তাৎপর্যই বা কী?
3
10
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়া পিতৃপক্ষের শেষ দিন। এই পক্ষটি প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ, তাঁদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
4
10
মহালয়ার পর শুরু হয় দেবীপক্ষ, যা দেবী দুর্গার আরাধনা ও শারদোৎসবের আগমনের বার্তা বহন করে।প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার দিন থেকেই দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের ক্ষণগণনা শুরু হয়।
5
10
বিশ্বাস করা হয়, কৈলাস থেকে সন্তানদের নিয়ে মর্ত্যে বাপের বাড়িতে আসেন উমা। তাই এই দিনটি একদিকে যেমন পূর্বপুরুষদের স্মরণের, অন্যদিকে তেমনই মা দুর্গাকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতির।
6
10
মহালয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রীতি হল তর্পণ। এই দিনে বহু মানুষ গঙ্গার ঘাটে কিংবা অন্য কোনও জলাশয়ের কাছে গিয়ে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে জল নিবেদন করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, তর্পণের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, কর্ণের পরলোকের অভিজ্ঞতা তাঁকে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে দান ও শ্রাদ্ধের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
7
10
মহালয়া বলতেই বাঙালির মনে প্রথমে ভেসে ওঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গম্ভীর কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ, সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ এবং পঙ্কজকুমার মল্লিকের সুরে ভক্তিগীতি—এই অনুষ্ঠান বহু দশক ধরে বাঙালির মহালয়ার সকালের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে।
8
10
মহালয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রতিমার চক্ষুদানের ঐতিহ্য। এই দিন দেবী দুর্গার চোখ আঁকার রীতি প্রচলিত। এই আচারকে ‘চক্ষুদান’ বলা হয়। শিল্পীর তুলির টানে প্রতিমার চোখ ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই যেন মৃন্ময়ী প্রতিমার মধ্যে দেবীর উপস্থিতি অনুভব করেন ভক্তরা।
9
10
২০২৬ সালে মহালয়া ১০ অক্টোবর, শনিবার। এর পর ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মাধ্যমে বাংলার দুর্গাপুজোর মূল পর্ব শুরু হবে। অর্থাৎ, মহালয়া থেকেই শুরু হবে পুজোর অপেক্ষা, আর কয়েক দিন পর দেবী দুর্গার বোধন ও পুজোর আনুষ্ঠানিকতা ঘিরে উৎসব জমে উঠবে।
10
10
মহালয়া তাই শুধু একটি তিথি নয় এটি বাঙালির কাছে স্মৃতি, বিশ্বাস, ভক্তি এবং আগমনী আনন্দের মিলনক্ষেত্র। একদিকে পূর্বপুরুষদের স্মরণ, অন্যদিকে উমার আগমনের অপেক্ষা এই দুই অনুভূতির মেলবন্ধনেই মহালয়া বাঙালির জীবনে এতটা বিশেষ হয়ে উঠেছে।