গুরপ্রীত সিং সান্ধুদের 'হেডস্যর' খালিদ জামিলের কাছের বন্ধু ছিলেন বসিরহাটের তপন ঘোষ। মনে আছে তাঁকে?
2
12
মাহিন্দ্রা উনাইটেড-মোহনবাগানের হয়ে দুদ্দাড়িয়ে খেলা তপন এখন বলছেন, ''কোনওরকম বেঁচে আছি। আমার খবর কেউ নেয় না। কেউ রাখতেও চায় না। বেঁচে আছি না মরে গিয়েছি, তাও জানতে চায় না কেউ।''
3
12
মাহিন্দ্রা ইউনাইটেডের জার্সিতে চার বছর খেলেছেন। জাতীয় দলের হয়েও তিনি রক্ষণে উজ্জ্বল ছিলেন। মোহনবাগানের ডিফেন্স আগলেছেন। খেলেছেন ডার্বি। সুব্রত ভট্টাচার্যের হাতে তখন সবুজ-মেরুনের রিমোট কন্ট্রোল। বাঙালির আবেগের সেই বড় ম্যাচে ব্রাজিলীয় ডু-র সঙ্গে মোহনবাগান রক্ষণের সেনানী ছিলেন তপন।
4
12
পরের মহমেডান স্পোর্টিং ম্যাচেই ঘটে গেল অঘটন। প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে সংঘর্ষে চোট পেয়ে ছিটকে গেলেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বঙ্গ-স্টপার। পায়ে অস্ত্রোপচার হয়। মাঠে আর ফেরা হয়নি। তপন শব্দের অর্থ সূর্য। সেই সূর্য অস্তাচলে গিয়েছে প্রায় দু' যুগ হল। তপন ঘোষ এখন বসিরহাট পুরসভার 'অপরাজিতা' গেস্ট হাউজের কেয়ারটেকার। আট ঘণ্টার ডিউটি করেন নিত্যিদিন।
5
12
আজকাল ডিজিটাল-কে তপন বলছিলেন তাঁর জীবনের সুখ-দুঃখের গল্প, ''অলোক দাস, বসিরহাট পুরসভার চেয়ারম্যান তপন সরকার এবং প্রাক্তন ফুটবলার দীপেন্দু বিশ্বাসের সহযোগিতায় এই গেস্ট হাউজের চাকরি পেয়েছিলাম। সেটাই এখনও করছি। এর সঙ্গে সোলাদানা ফুটবল ক্যাম্পে কোচিং করাই ছোট ছোট ছেলেদের। বসিরহাট হাইস্কুলের ফুটবল কোচও আমি।''
6
12
মাসিক চার হাজার টাকা বেতনে শুরু করেছিলেন কেয়ারটেকারের কাজ। এই বেতনে জলও গরম হওয়ার নয়। তপন বলছেন, ''বাবা-মা আমার পরম বন্ধু। ওয়ান ম্যান আর্মির মতো আমাকে আগলে রেখেছিল মা। আরেকটা কথা না বললেই নয়। ভাগ্য করে আমার স্ত্রীকে পেয়েছিলাম। আমার পাশে সবসময়ে সে রয়েছে। সাত-আট হাজার টাকা উপার্জন করে এমন ছেলের সঙ্গে কোনও মেয়ে সংসার করছে, এমন দৃষ্টান্ত আজকের দিনে নেই বললেই চলে।'' নিদারুণ বাস্তব তুলে ধরেন একসময়ের ডিফেন্ডার।
7
12
কিন্তু তিনি দমবার পাত্র নন। বলছেন, ''আমার শরীরে চারটে অস্ত্রোপচার হয়েছে। আমি এখনও বাঘের সঙ্গে লড়তে পারি। আমি হারব না কিছুতেই। সম্মান নিয়ে বাঁচব।''
8
12
২০০০ সালে জাতীয় দলের হয়ে মলদ্বীপে খেলতে গিয়েছিলেন তপন। সেই দলের সদস্য ছিলেন দুই দিকপাল-ভাইচুং ভুটিয়া ও আইএম বিজয়ন। ফিরে এসে ইংল্যান্ড সফর। ভারতীয় দলের টিডি তখন পিকে ব্যানার্জি। কোচ সুখবিন্দর সিং। চার বছর জাতীয় দলের ফার্স্ট টিমের প্লেয়ার ছিলেন বঙ্গতনয়।
9
12
তপনের প্রিয় ফুটবলার আইএম বিজয়ন। অলস কোনও বিকেলে ভারতীয় ফুটবলের 'কালো হরিণ'-এর সঙ্গে খেলার স্মৃতি ভেসে ওঠে তাঁর দু'চোখে। স্মৃতিরোমন্থন করে তিনি বলেন, ''রোভার্স কাপের একটা ম্যাচে বিজয়ন আমাকে এমন ভাবে বোকা বানিয়েছিল...। বিজয়নই আমার স্বপ্নের ফুটবলার।''
10
12
তপন বিলাপ করেন, ''দেশের হয়ে খেলে চাকরি পেলাম না! সহযোগিতা তো দূর অস্ত। বেনিফিট ম্যাচ করে কেউ সাহায্য করবে, সেটাও হল না। অনেক দরবারে গিয়েছি। সান্ত্বনাই কেবল পেয়েছি। কাজের কাজ কিছু হয়নি। আমি এখন কাউকেই বলি না যে আমি ফুটবল প্লেয়ার ছিলাম।''
11
12
অপ্রাপ্তির বেদনা দূর হয়ে যায় খুদে প্রতিভাদের দেখে। তাঁর ছেলেও ফুটবল খেলছে। কথায় বলে, 'বাপ কা বেটা, সিপাহি কা ঘোড়া।' ছেলেকেও স্টপার বানাতে চান তপন। এখনকার ফুটবল তাঁকে আর আকর্ষণ করে না। প্রাক্তন ডিফেন্ডার বলছেন, ''চল্লিশ মিনিট সাইকেল চালিয়ে ক্যাম্পে যাই ফুটবল শেখাতে। বাকি খুব চেষ্টা করে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলোর যখন যা দরকার এগিয়ে দেয় আমার ভাই বাকি। আমাকেও আর্থিক ভাবে সাহায্য করে বাকি। আমাদের একটাই লক্ষ্য ভাল ফুটবলার তৈরি করতে হবে। বড় ক্লাবের সাপ্লাই লাইন আমরাই।''
12
12
একা স্টপার লড়ে যান জীবনযুদ্ধে। মতি নন্দীর 'স্টপার' জীবনের শেষ ম্যাচ খেলার পরে কপালে মাঠের মাটি ঠেকিয়ে বলেছিল, ''নতুন নতুন ছেলেরা আসবে তোমাকে গৌরব দিতে। দয়া করে আমাকে একটু মনে রেখো।” বাস্তবের ডিফেন্ডার যেন বলছেন,''দিনের পথিক মনে রেখো, আমি চলেছিলেম রাতে, সন্ধ্যাপ্রদীপ নিয়ে হাতে।''