সময়টা আটের দশকের শুরুর দিকে। কলকাতায় তখন ‘ঘরে বাইরে’ ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত সত্যজিৎ রায়। ঠিক সেই সময়েই বিশ্বের সাহিত্যজগতে ঝড় তোলা এক ঔপন্যাসিক চাইলেন ‘মানিকদা’র কাজের জাদু নিজের চোখে দেখতে। তিনি আর কেউ নন—সলমন রুশদি। সুদূর ইংল্যান্ড থেকে উড়ে এসে তিনি হাজির হয়েছিলেন সত্যজিতের সেটে, কাটিয়েছিলেন বেশ কিছুটা সময়।

দুই বিশ্বখ্যাত প্রতিভার এই অজানা এবং রোমাঞ্চকর মোলাকাতের গল্পটি সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক সুমন ঘোষ। সত্যজিৎ রায়ের পুত্র সন্দীপ রায় এবং খোদ সলমন রুশদির মুখ থেকে শোনা এই দুই সংস্কৃতির মেলবন্ধনের গল্পটি যেমন সুন্দর ততটাই আকর্ষণীয়।

 

পরিচালক সুমন ঘোষ জানান, বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে সত্যজিৎ-পুত্র সন্দীপ রায়ের সঙ্গে আড্ডায় প্রথম এই ঘটনার কথা জানতে পারেন তিনি। সন্দীপ রায় স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, রুশদি সেটে আসছেন শুনে ‘ঘরে বাইরে’র পুরো কাস্ট এবং ক্রু মারাত্মক উত্তেজিত ছিলেন।
পরবর্তীকালে নিউ ইয়র্ক ইন্ডিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে খোদ সলমন রুশদির মুখেও এই ঘটনার সত্যতা শোনেন সুমন ঘোষ। পরিচালককে রুশদি জানিয়েছিলেন, সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনা দেখার পাশাপাশি কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ করে তিনি কতটা মুগ্ধ ও মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছিলেন।

সত্যজিৎ রায়ের প্রতি রুশদির এই মুগ্ধতা কেবল সেটে পরিদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ‘লন্ডন রিভিউ অফ বুকস’-এ রায়কে নিয়ে একটি চমৎকার নিবন্ধ লিখেছিলেন রুশদি। তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধের বই ‘ইমাজিনারি হোমল্যান্ডস’-এও রয়েছে সত্যজিৎ-বন্দনা। সবচেয়ে বড় চমকটি রয়েছে রুশদির বিখ্যাত ফ্যান্টাসি উপন্যাস ‘হারুন অ্যান্ড দ্য সি অফ স্টোরিজ’-এ। এই উপন্যাসের দুটি চরিত্র ‘গুপী’ এবং ‘বাঘা’ আসলে সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী সৃষ্টি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর প্রতি রুশদির এক অনন্য শ্রদ্ধার্ঘ্য।

 


সুমন ঘোষের এই ফেসবুক পোস্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হল সত্যজিৎ রায়ের ব্যক্তিগত লাইব্রেরির একটি গোপন তথ্য। অস্কারজয়ী এই বাঙালি পরিচালকের বইয়ের তাক ঘাঁটতে ঘাঁটতে সুমন ঘোষের চোখে পড়ে সলমন রুশদির উপহার দেওয়া একটি বই। বইটির ভেতরে সত্যজিতের উদ্দেশে নিজের হাতে একটি অত্যন্ত সুন্দর ও আবেগঘন উৎসর্গবার্তা লিখে সই করেছিলেন বুকারজয়ী এই লেখক।

ইতিহাসের পাতায় এই দুই মায়েস্ত্রোর সাক্ষাৎ হয়তো খুব বেশি চর্চিত হয়নি, কিন্তু সুমন ঘোষের এই স্মৃতিচারণ প্রমাণ করে দেয়—শিল্পের কোনও সীমানা হয় না। অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রকার আর বুকারজয়ী সাহিত্যিকের সেই রসায়ন আজও জীবন্ত বিশপ লেফ্রয় রোডের লাইব্রেরির বইয়ের পাতায়।