পর্দায় ওঁর উপস্থিতি মানেই হাসির রোল। ‘পড়োশন’, ‘বোম্বে টু গোয়া’ কিংবা ‘গুমনাম’-এর মতো ছবিতে নিজের কৌতুক অভিনয়ের মাধ্যমে দশকের পর দশক দর্শককে মাতিয়ে রেখেছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা মেহমুদ। কিন্তু যে মানুষটি সারাজীবন বিশ্বকে হাসিয়ে গেলেন, ওঁর নিজের ব্যক্তিগত জীবন কি সত্যিই হাসিখুশি ছিল? বর্ষীয়ান লেখক হানিফ জাভেরি-র সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে উঠে এল মেহমুদের জীবনের এক অন্ধকার ও যন্ত্রণাময় অধ্যায়। বিশেষ করে ওঁর ছেলে, জনপ্রিয় গায়ক লাকি আলি-র সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক এবং পারিবারিক টানাপোড়েন নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করেছেন জাভেরি।

একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে হানিফ জাভেরি দাবি করেছেন, মেহমুদ ওঁর সন্তানদের নিয়ে সারাজীবন প্রবল মানসিক অশান্তিতে ভুগেছেন।
হানিফ জাভেরি জানান, সফল গায়ক ও অভিনেতা হওয়ার আগে লাকি আলি এবং ওঁর অন্যান্য ভাইবোনরা মেহমুদকে চূড়ান্ত সমস্যায় ফেলেছিলেন। জাভেরির কথায়, “লাকি আলি পরে জীবনে সফল হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু পারিবারিক দিক থেকে বিচার করলে ও মেহমুদকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। লাকি আলি এবং ওঁর কিছু ভাইবোন পুরোপুরি মেহমুদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। মেহমুদ ঘরে কিছু আনলে তা বাইরে বিক্রি হয়ে যেত। কেউ বাড়ি থেকে পালিয়ে যেত, কেউ অন্য কোনও সমস্যা তৈরি করত। মেহমুদের ঘরে সবসময় একটা অশান্তির পরিবেশ লেগেই থাকত।”

 

জাভেরি আরও অভিযোগ করেছেন যে, লাকি আলির ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে একসময় মেহমুদ ওঁকে মারাত্মকভাবে মারধরও করেছিলেন। তিনি জানান, লাকি আলি সফল হওয়ার আগে মেহমুদ ওঁর কাছের মানুষদের কাছে মাঝেমধ্যেই দুঃখ করে বলতেন, “ইয়ার, আমি এই ছেলেটার জন্য খুব চিন্তায় আছি।”মেহমুদ ওঁর সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য এবং ওঁরদের নিরাপত্তার কথা ভেবে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ, সেই টাকার বেশিরভাগটাই বিলাসিতা ও নেশার পেছনে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ওঁর সন্তানেরা।

কেন একটি সফল পরিবারের অন্দরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল? জাভেরি এর কারণ হিসেবে মেহমুদের পারিবারিক পরিবেশকেই দায়ী করেছেন। ওঁর মতে, “বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, সন্তানদের বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া এবং মেহমুদের সিনেমার কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ততা— এই সব মিলিয়েই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। ভেঙে যাওয়া পরিবারগুলোতে এমনটা প্রায়ই ঘটে। বাচ্চারা সঠিক গাইডেন্স পায়নি। ফলে কেউ নেশার কবলে পড়েছে, কেউ বা মদে আসক্ত হয়েছে এবং তিলে তিলে পরিবারটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।”

পাশাপাশি লাকি আলির একাধিক বিয়ে ও বিচ্ছেদ নিয়েও কথা বলেছেন জাভেরি। তিনি মনে করেন, সম্পর্কের যত্ন নেওয়া এবং তা টিকিয়ে রাখার ক্ষমতার অভাব ছিল সেখানে।মেহমুদ ওঁর মেজ ছেলে মাকদুম আলি এবং মাসুম আলিকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন বলে জানান লেখক। বাকিদের নিয়ে ওঁর দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। তবে জাভেরি মনে করেন, মেহমুদের প্রকৃত মাহাত্ম্য সেখানেই ছিল— যিনি নিজের সমস্ত ব্যক্তিগত হাহাকার আর পারিবারিক যন্ত্রণাকে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রেখে ক্যামেরার সামনে সারা দেশবাসীকে হাসাতেন।

মেহমুদের এই উত্তরাধিকার আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পর্দার হাসির আড়ালে লুকানো সেই যন্ত্রণার কাহিনি উন্মোচিত হয়ে আজ ২০২৬ সালেও ওঁর অনুরাগীদের মনে বিষাদের ছায়া ফেলেছে।