কাজের শেষে সঠিক সময়ে পারিশ্রমিক বা বেতন পাওয়া যেকোনও কর্মচারীর মৌলিক অধিকার। কিন্তু ভারতে আজও অধিকাংশ সংস্থায় মাসের ১ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে বেতন দেওয়ার যে দস্তুর রয়েছে, তা নিয়ে এবার তীব্র আপত্তি তুললেন ‘শাদি ডট কম’ এবং ‘পিপল গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা তথা সিইও অনুপম মিত্তল। ‘শার্ক ট্যাঙ্ক ইন্ডিয়া’-র এই জনপ্রিয় বিচারকের মতে, ভারতীয় কোম্পানিগুলোর উচিত কর্মচারীদের মাসে একবার নয়, বরং প্রতি ১৫ দিনে একবার বেতন দেওয়া।

অনুপম মিত্তল ওঁর অফিশিয়াল লিংকডইন (LinkedIn) অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে কর্পোরেট দুনিয়ার এই বহু পুরনো ‘ব্রিটিশ আমলের নিয়ম’ বা নেক্সট-মান্থ পেআউট সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ওঁর মতে, এই সামান্য পরিবর্তনের ফলে কর্মচারীদের ইএমআই বা ঘরভাড়া দেওয়ার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি মিলবে।

লিংকডইন পোস্টে অনুপম মিত্তল আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতির দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে লেখেন -“কোম্পানিগুলো আজকাল বাড়তি ছুটি, বিনামূল্যে খাবার কিংবা ওয়ার্ক ফ্রম হোমের সুবিধা দিয়ে নিজেদের ‘এমপ্লয়ি-সেন্ট্রিক’ বা কর্মচারী-বান্ধব বলে দাবি করে। কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান সুবিধাটিকেই সবাই অবহেলা করে। বেশিরভাগ কোম্পানি মাসের ৭ তারিখে বেতন দেয়। কেউ কেউ ১ তারিখে দেয়, তবে যদি ওইদিন উইকএন্ড বা ছুটি থাকে, তবে সেটা পিছিয়ে ২, ৩ বা ৪ তারিখ হয়ে যায়। কয়েক বছর আগে আমরা ‘শাদি ডট কম’-এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, বেতন পরের মাসে নয়, চলতি মাসের একেবারে শেষ দিনেই অ্যাকাউন্টে ঢুকে যাবে। এটা কোনও দয়া বা সুযোগ-সুবিধা নয়, এটা সাধারণ জ্ঞান।”

অনুপম আরও যোগ করেন, “কিছু মানুষের কাছে বেতনের এক সপ্তাহের বিলম্ব স্রেফ খাতার হিসেব বা একটা অ্যাকাউন্টিং ডিটেইল হতে পারে। কিন্তু সাধারণ কর্মচারীদের জন্য এর অর্থ হল— ইএমআই বাউন্স হওয়া, ঘরভাড়া দেওয়ার জন্য হন্যে হয়ে টাকা খোঁজা, কোনও অস্বস্তিকর ফোন কল পাওয়া কিংবা একটা না ভাঙা জিনিস জোড়া লাগাতে গিয়ে অর্ধেক দিন নষ্ট করা।”

“২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ১৫ দিনে একবার বেতন দেওয়া কোনো রকেট সায়েন্স নয়!”
ভারতে কর্মচারীদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে অনুপম মিত্তল মাসে দু’বার— অর্থাৎ প্রতি মাসের ১৫ এবং ৩০ তারিখে বেতন দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছেন। ওঁর এই আইডিয়া পে-রোল বা অ্যাকাউন্টস টিমকে বাড়তি খাটুনি দিতে পারে স্বীকার করেও অনুপম বলেন, “ভারতের সিংহভাগ মানুষকে জিজ্ঞেস করলে তাঁরা বলবেন— সঠিক সময়ে ক্যাশ ফ্লো বা টাকার জোগানই হল মানুষের সম্মান । আমি মনে করি, কোম্পানিগুলোর মাসে দু’বার বেতন দেওয়া উচিত। হ্যাঁ, এতে পে-রোল টিমের কর্মীরা একটু ঘ্যানঘ্যান করতে পারেন। কিন্তু ২০২৬ সালের এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে এটা কোনও রকেট সায়েন্স  নয়। কর্মচারীদের হাতে নিয়মিত টাকা থাকলে মানসিক চাপ কমবে, মানুষ ঋণের ফাঁদে কম পড়বে, বাজারে খরচের গতি বাড়বে এবং এর ফলে দেশের জিডিপি -ও চাঙ্গা হবে। এটা কর্মচারী, কোম্পানি এবং দেশের অর্থনীতি— তিনজনের জন্যই লাভজনক। তাহলে এইচআর -দের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই ব্রিটিশ আমলের নিয়মটা এবার বন্ধ করা যাক?”


অনুপম মিত্তল ভারতীয় স্টার্ট-আপ জগতের অন্যতম চেনা মুখ। ১৯৯৭ সালে তিনি ‘সগাই ডট কম’  শুরু করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে ১৯৯৯ সালে ‘শাদি ডট কম’ নামে নতুন রূপ পায়। ২০১৫ সালের জুলাই মাসের মধ্যেই তিনি ইন্টারঅ্যাক্টিভ অ্যাভিনিউজ, দ্রুভ, বিগবাস্কেট, ফেয়ারআই, কেটো-র মতো প্রায় ২০০টি স্টার্ট-আপে বিনিয়োগ করেছিলেন।

২০২১ সালে স্টার্ট-আপ ভিত্তিক রিয়ালিটি শো ‘শার্ক ট্যান্ক ইন্ডিয়া’ শুরু হওয়ার পর থেকে অনুপম মিত্তল আপামর ভারতবাসীর ঘরে ঘরে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন। প্রথম সিজনে ওঁর সঙ্গে বিচারকের আসনে ছিলেন আশনীর গ্রোভার (ভারত-পে), বিনীতা সিং (সুগার কসমেটিক্স), আমান গুপ্তা (বোট), পীযূষ বনসল (লেন্সকার্ট), নমিতা থাপার এবং গজল অলঘ। শো-টির সাম্প্রতিকতম সিজনেও সমান দাপটের সঙ্গে বিচারকের আসন অলঙ্কৃত করেছেন অনুপম। আর এবার ২০২৬-এর জুন মাসে দাঁড়িয়ে ওঁর এই ‘১৫ দিনে বেতনের’ বৈপ্লবিক ফর্মুলা দেশের চাকুরিজীবী মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছে।