বেরঙিন নাকি রংচঙে, কোন দুনিয়ায় সত্যি খুঁজবে ‘ব্রাউন’? সিরিজ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।

রিটা ব্রাউন। জি ফাইভের নতুন সিরিজ ‘ব্রাউন’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র। কলকাতা পুলিশের তুখোড় গোয়েন্দা অফিসার। তাঁর নামেই কি এ সিরিজের নামকরণ?
উত্তরটা হ্যাঁ। এবং না-ও বটে। কারণ রিটা ব্রাউনের ব্যক্তিজীবন, কসমোপলিটান কলকাতাতেও লুকিয়ে থাকা আঁধারজীবন, তার অলিগলি থেকে পাকস্থলী, পেশাগত পরিসরে রিটাকে ঘিরে থাকা মানুষগুলোর জীবন, সবটাই যে বড্ড খয়েরি রঙে মোড়া। সে রং কারও বিষণ্ণতার, কারও অতীতের, কারও মানসিক গঠনে, কারও আবার অপরাধ মনস্কতায়। সেই খয়েরি রঙা দুনিয়ার বাকি রংগুলোও বড্ড কালচে। কালো, ঘন নীল, গাঢ় সবুজ, ধুসরে কখনও ধরা দেয় মনের অলিগলি, কখনও বা শহর কলকাতার মেঘলা দুপুর, মরে আসা আলোর সন্ধে কিংবা টিমটিমে আলো মাখা রাত। 
ডিসিডিডি রিটা ব্রাউন (করিশ্মা কাপুর) নিজেই এক বৈপরীত্য বয়ে বেড়ায় তার আপাদমস্তকে। একদিকে সে শানিত বুদ্ধিমত্তায়, কাজের দক্ষতা-ক্ষিপ্রতায় সূর্যের মতো ঝকঝকে। অন্য দিকে অকালে স্বামী নীতিন (শান) এবং জন্মের আগেই সন্তানকে হারিয়ে ফেলার টালমাটাল শোকে মদ-সিগারেটের নেশায় ডুবে থাকা। সেই আঁধারে আলোর রেখা বলতে শুধু মা জ্যানিস (সোনি রাজদান), আন্ট বার্থা (হেলেন) এবং অ্যাংলোপাড়ার জীবনের ছোট্ট ছোট্ট খুশির মুহূর্তগুলো। কর্মক্ষেত্রে জুনিয়ার অফিসার, দুর্ঘটনায় স্ত্রী ও একরত্তি মেয়েকে হারিয়ে বিধ্বস্ত অর্জুন সিনহার (সূর্য শর্মা) সঙ্গে চেনা ছকের রেষারেষির সম্পর্ক নয় তার। বরং প্রকৃত অর্থেই সহযোগীর মতো অর্জুন রিটার অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন নিয়ে, নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় থাকে। রিটাও নিজে পিছিয়ে গিয়ে সাফল্যের পথে অর্জুনকে এগিয়ে দিতে পিছপা হয় না। 
এহেন রিটা ও অর্জুনের হাতে আসে কলকাতা জুড়ে হইচই ফেলে দেওয়া এক কেস। শহরের প্রবল প্রতাপশালী শিল্পপতি, মুখ্যমন্ত্রীর অতি ঘনিষ্ঠ ধীরজ জয়সওয়াল (অজিঙ্কা দেও) ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ননীর (মেঘনা মালিক) একমাত্র কন্যা অহনার মুণ্ডচ্ছেদ করে নৃশংস হত্যার তদন্তভার। যার নেপথ্যে সুতোর টানে সবটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান ধীরজ স্বয়ং। আর তাই সিসিটিভিতে এক ড্রাগবিক্রেতাকে অহনার পিছু নিতে দেখা যাওয়া মাত্র তাকেই আততায়ী হিসেবে চিহ্নিত করে দেওয়ার চাপ আসতে থাকে।

কিন্তু রিটা এভাবে পিছু হঠতে নারাজ। অর্জুন, ফরেন্সিক অফিসার দুর্গা সামন্ত (খরাজ মুখোপাধ্যায়), লালবাজারের গোয়েন্দা দফতরের হ্যাকার এবং লোকেশন ট্র্যাকিং এক্সপার্ট, ট্যাংরার চিনেপাড়ার ‘কলকাতার উইকিপিডিয়া’ জন জন এবং বো ব্যারাকের এথিক্যাল হ্যাকার লিসাকে সঙ্গে নিয়ে সে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। ইতিমধ্যে অহনার মনোবিদ সন্দীপ চক্রবর্তী (যিশু সেনগুপ্ত) এসে জানিয়ে দেয়, অহনা মানসিক ভাবে কতটা নড়বড়ে ছিল। এ-ও জানা যায়, মৃত্যুকালে সে অন্তঃসত্ত্বা ছিল। একে একে রিটা-অর্জুনের সন্দেহের তালিকায় ঢুকে পড়ে অহনার প্রাক্তন প্রেমিক সৈকত (আরিয়ান ভৌমিক), প্রিয়তম বান্ধবী শেফালি (অহল্যা শেট্টি), সৎ দাদা সঞ্জয় (পরেশ পাহুজা) এবং বৌদি অনন্যা (পামেলা ভুতোরিয়া)। এ সবের মাঝেই ঠিক একই কায়দায় শহরের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ ঊষার হত্যাকাণ্ডে ফের শোরগোল পড়ে যায়। ঊষার রেখে যাওয়া এক অডিও ক্লিপ থেকে বেরিয়ে আসে শিউরে ওঠার মতো কিছু তথ্য। এই দুই মৃত্যুই কি এক সুতোয় গাঁথা? কোন রহস্য লুকিয়ে আছে অহনার মৃত্যুতে? রিটা আর অর্জুন কি আততায়ীর নাগাল পাবে শেষমেশ? অভিনব দেওয়ের পরিচালনায় সেই নিয়েই এগিয়েছে টানটান রহস্যভেদের এই কাহিনি। 

এ সিরিজের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট পরিচালকের পরিমিতি বোধ, কাহিনি-চিত্রনাট্যকারের তরফে ক্রমাগত টুইস্টের চেনা ফাঁদে পা না দিয়ে গল্প বোনার মুন্সীয়ানা এবং অবশ্যই দুরন্ত অভিনয়। তাই গল্প বলা, তার চলন, আকার কিংবা গঠন সবটাই একেবারে মাপ মতো, মেদবর্জিত। লাগাতার টুইস্টে  চমক দেওয়া নেই। বদলে প্রতিটা চরিত্রকে, তাদের নিজস্ব আবেগ এবং ব্যক্তিজীবনকে মূল গল্পের সঙ্গে মেলাতে মেলাতে এগিয়ে চলা দর্শককে তাদের সঙ্গে একাত্ম করে তোলে সহজেই। আর তাকেই যোগ্য সঙ্গত দেয় অভিনয়ের বলিষ্ঠতা। একদিকে পেশাগত সাফল্য আর ব্যক্তিজীবনের শোকের মিলমিশে প্রায় মেকআপহীন, ধস্ত মনের রিটাকে জীবন্ত করে তোলেন করিশ্মা। অন্যদিকে স্ত্রী-মেয়ের অকালমৃত্যু মেনে নিতে না পারা, ডিমেনশিয়া আক্রান্ত বাবাকে (কে কে রায়না) যত্নে রাখতে চেয়ে চাকরি বাঁচাতে চাওয়া অর্জুনকে সমানতালে বিশ্বাসযোগ্য করে রাখেন সূর্যও। মনোবিদ সন্দীপের চরিত্রের নানা দিককে যথারীতি যত্নে, দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন যিশু। সংক্ষিপ্ত পরিসরে বেশ লাগে খরাজ এবং আরিয়ানকেও। হেলেন, সোনি, অজিঙ্কা, পরেশ-সহ বাকি প্রতিটা চরিত্রেই অভিনেতারা যে যার মতো করে চোখ টেনে গিয়েছেন বলিষ্ঠ অভিনয়ে।

আরও দুটো দিক দাগ কাটে। হিন্দি সিরিজ, তবু গল্প তো এই কলকাতার বুকে। তাই চেনা পথে হেঁটে অহেতুক সবাইকে দিয়ে হিন্দি না বলিয়ে বাঙালি চরিত্রদের বাংলায় এবং অ্যাংলো পাড়ার মানুষদের ইংরেজি সংলাপ রাখাটা অনেক বেশি মনে ধরে। দ্বিতীয়ত, জায়গা মতো রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং লোকগানের ব্যবহারও বেশ লেগেছে। 
যদিও সমস্যার দিকগুলোও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। যেমন, গোটা সিরিজ জুড়েই সিনেম্যাটোগ্রাফিতে সারাক্ষণ স্রেফ খয়েরি, কালো, ধূসর, গাঢ় নীল বা সবুজ, বাদামী-ঘেঁষা মরচে হলুদের মতো ফ্রেম দেখতে দেখতে মনে হয় যেন নিও নুয়া (Neo Noir) ঘরানাকে খানিকটা চোখে আঙুল দিয়েই দেখিয়ে বা বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। অথবা হয়তো প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেওয়া চরিত্রগুলোর কার মনের ভিতরে কতটা অপ্রাপ্তি, কতটা শোক, কতখানি বিশ্বাসঘাতকতার জ্বালা, প্রবৃত্তির দাসত্ব বা অপরাধমনস্কতা লুকিয়ে আছে। তা ছাড়া, বর্তমান সময়ের একটা কসমোপলিটান শহরে উত্তর কলকাতা থেকে ট্যাংরা কিংবা বো ব্যারাক— রাত নামলেই ধনী থেকে গরিব সব বাড়িতেই এমন টিমটিমে আলো-আঁধারি; এ ব্যাপারটাও বিশ্বাসযোগ্যতার বাইরে হাঁটে। আর খানিকটা একঘেয়েও লাগে বটে। তৃতীয়ত, রিটার জীবনের শোকগ্রস্ততা বোঝাতে বার বার একই ধাঁচে মদ-সিগারেটে ডুবে থাকা কিংবা মৃত স্বামীকে অনবরত দেখতে পাওয়ার দৃশ্যগুলোও একটু ক্লান্তিকর লাগে কোথাও কোথাও।


তবে সবচেয়ে যেটা ধাক্কা দেয়, তা হল মোটামুটি কয়েক পর্ব পেরিয়েই এখনকার থ্রিলারপ্রেমী দর্শক দিব্যি বুঝে ফেলতে পারবেন আততায়ী কে। রিটা বা অর্জুনের মতো এমন দক্ষ অফিসারদের তা হলে এতটা সময় লাগল কীসে? 

শেষমেশ অবশ্য খামতিগুলো ঢেকে দিয়েছে তুখোড় অভিনয়, চরিত্রগুলোর বুনোট, এবং চেনা ছকের বাইরে হেঁটে গল্প বলার চেষ্টা। আততায়ীকে ঢের আগে চিনে ফেলার পরেও শেষপাতের টুইস্টটা তাই মন্দ লাগে না কিন্তু!