বলিউডে মহাকায়, পুরাণ নিয়ে উন্মাদনার শেষ নেই। কিন্তু যখনই তুলনা আসে ওম রাউতের বহুল আলোচিত ‘আদিপুরুষ’ আর নিতিশ তিওয়ারির আসন্ন মেগাবাজেট ‘রামায়ণ’ এর—তখন বিতর্ক যেন এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়। ২০২৩ সালের সেই দুঃস্বপ্নকে পেছনে ফেলে, যখন এদিন নিতিশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’-এর ট্রেলার সামনে এল, তখন থেকেই শুরু হয়েছে নতুন সমীকরণ। একপাশে রাঘবের রাগ ও যুদ্ধের ময়দানে প্রভাসের হুঙ্কার, আর অন্যপাশে ত্যাগের প্রতীক শান্ত-সমাহিত রাম রূপে রণবীর কাপুর—দুই ছবির ব্যবধানটা আকাশ-পাতাল।
আদিপুরুষের সেই কৃত্রিম ভিজ্যুয়াল এফেক্টস এবং ভিডিও-গেমের মতো দৃশ্যগুলো আজও ভক্তদের মনে একরাশ ক্ষোভ জমিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার ব্রহ্ম মুহূর্তে মুক্তি পাওয়া রামায়ণের ট্রেলার সেই ক্ষতে যেন প্রলেপ লাগাল। বিশাল বাজেটের এই ক্যানভাসে যেমন রয়েছে মাটির গন্ধ, তেমনই রয়েছে এক অন্যরকম আবেগ। চলুন দেখে নেওয়া যাক, ৪০০০ কোটি টাকার এই দুই মহারথী ছবির আসল ফারাক কোথায়।
আদিপুরুষে প্রভাসের রাম চরিত্রটি ছিল মূলত একজন অ্যাকশন হিরোর মতো। যুদ্ধের ময়দানে হুংকার দেওয়া, হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং শত্রুর ওপর রাগ প্রকাশ করাই ছিল তার মূল বৈশিষ্ট্য। "অহঙ্কারেরর বুক চূর্ণ করে দাও"—এই সংলাপেই স্পষ্ট ছিল যে চরিত্রটি অনেকটাই অ্যাকশন-ভিত্তিক।
পক্ষান্তরে, রামায়ণের ট্রেলারে রণবীর কাপুরের এন্ট্রি সম্পূর্ণ আলাদা। বনবাসে থেকেও তার মুখে যখন শোনা যায়— "আমার জীবন যদি সমৃদ্ধির মূল্য হয়, তবে তা আমি আনন্দের সঙ্গেই দেব"—তখন পরিষ্কার হয়ে যায় যে এখানে মারকাটারি অ্যাকশন নয়, বরং ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’ রামের আসল রূপ। ত্যাগ, সংযম ও ত্যাগের মূর্ত প্রতীক হিসেবে রণবীর এখানে এক অন্য উচ্চতায় ধরা দিয়েছেন।
আদিপুরুষে সইফ আলি খানের ‘লঙ্কেশ’ লুক নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। আধুনিক বাজকাট চুল, নীল চোখ আর গথিক স্টাইলিংয়ের সেই চরিত্রটিকে আধুনিক কোনও রূপকথার সিরিজের ভিলেনের মতো লেগেছিল, যা মূল রামায়ণের সঙ্গে বিন্দুমাত্র মেলে না।
এর সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটেছেন যশ। রামায়ণের ট্রেলারে যশের রাবণ রূপ এককথায় চোখ ধাঁধানো। সোনালী বর্ম, রাজকীয় ঐতিহ্যবাহী স্টাইল আর চোখেমুখে এক অদ্ভুত বিপদজ্জনক আকর্ষণ—সব মিলিয়ে যশকে লঙ্কার শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান রাজা হিসেবে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ট্রেলারে রামের সেই ডায়লগ— "রাবণ যদি তিন লোকের রাজা হয়, তবে তিন বিশ্ব-ই তার মৃত্যু দেখবে"—চরিত্রটির ওজন দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আদিপুরুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল এর সিজিআই ও ভিএফএক্স। মনে হচ্ছিল কোনও কার্টুন বা ভিডিও গেম চলছে। কিন্তু রামায়ণের ক্ষেত্রে নির্মাতারা সেই ভুল করেননি। অযোধ্যা থেকে শুরু করে স্বয়ংবর সভা, ঘন বন বা যুদ্ধের ময়দান—সব জায়গাতেই 'ফিজিক্যাল সেট'-এর সঙ্গে ভিএফএক্সের নিখুঁত মিশ্রণ চোখে পড়ে। এমনকি ‘জটায়ু’-র মতো কাল্পনিক চরিত্রগুলোকেও অবিশ্বাস্য রকম বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও আকাশ-পাতাল তফাত। আদিপুরুষে অজয়-অতুল চমৎকার গান দিলেও তা মূলত লাউড এবং ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান-কেন্দ্রিক ছিল। পক্ষান্তরে, রামায়ণে যখন হান্স জিমার এবং এ আর রহমানের যৌথ অর্কেস্ট্রাল ও ঐতিহ্যবাহী সুর বেজে ওঠে, তখন গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ট্রেলারটির শুরুতেই ছবিটিকে ঘোষণা করা হয়েছে— "মানব সভ্যতার ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ গল্প" হিসেবে।
















