টলিপাড়ায় ইদানীং চেনা ঘরানার মেলোড্রামা কিংবা মারকাটারি অ্যাকশন ছবির চেনা ছক ভাঙছে। তথাকথিত বাণিজ্যিক ছবির ফর্মুলা ঝেড়ে ফেলে দর্শক এখন বেশি পছন্দ করছেন সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের বাস্তবসম্মত অন্য ধারার সিনেমা। এবার তেমনই এক ভিন্ন স্বাদের ও মনস্তাত্ত্বিক গল্প নিয়ে বড়পর্দায় হাজির নতুন বাংলা ছবি ‘ফেরা’। ‘নন্দী মুভিজ’-এর প্রযোজনায় এই ছবিটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন ‘মুখার্জীদার বউ’ খ্যাত পরিচালক পৃথা চক্রবর্তী।

তবে এই ছবির সবচেয়ে বড় চমক অন্য জায়গায়। ‘ফেরা’-র হাত ধরেই প্রথমবার বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখলেন বলিউডের প্রখ্যাত, শক্তিশালী ও খামখেয়ালি চরিত্রের জাদুকর অভিনেতা সঞ্জয় মিশ্র। ছবিতে ওঁর সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেছেন টলিউডের অভিনয়ের ‘পাওয়ারহাউস’ ঋত্বিক চক্রবর্তী। ছবিতে সঞ্জয় মিশ্রের চরিত্রের নাম ‘পান্নালাল’, যিনি সম্পর্কে ঋত্বিক অর্থাৎ ‘পলাশ’-এর বাবা। এ ছাড়াও দুই গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রে দেখা যাবে সোহিনী সরকার ও প্রিয়াঙ্কা সরকারকে।

সম্প্রতি এই ছবির জোরদার প্রচার সারতে খাস কলকাতায় পা রেখেছিলেন সঞ্জয় মিশ্র। আর শহরের এক সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে খোশমেজাজে আড্ডা দেওয়ার সময় তাঁর কথায় উঠে এল এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া, প্রয়াত বাবার কথা এবং তাঁর জীবনের এক রুদ্ধশ্বাস ম্যাজিক।

 

সঞ্জয় মিশ্রের কাছে জীবন মানেই সময়ের এক অদ্ভুত কোলাজ। সময়কে তিনি কতটা মূল্য দেন, তা ওঁর দুই মেয়ের নাম শুনলেই বোঝা যায়। অভিনেতা বলেন, “সময় ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। আমি তো খুব, খুব মানি... আমার জীবনে সময় ব্যাপারটা যেভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে তা অবিশ্বাস্য। সেইজন্য তো নিজের দুই মেয়ের নাম রেখেছি ‘পল’ এবং ‘লমহা’ । হিন্দিতে সময়ের সূচক এই দুই নাম। ছেলে হলে নাম ভেবে রেখেছিলাম ‘আগমন’। সেই নামটিও সময়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।”

কলকাতায় পা রেখে পুরোনো স্মৃতির সরণি বেয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন বলিউডের এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। কথা বলতে বলতে ওঁর গলায় খেলে যায় এক অদ্ভুত আবেগের সুর। বাবার ডায়েরির পাতা ওল্টানোর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে সঞ্জয় বলেন, “জানেন, আমার বাবার প্রথম কাজ কলকাতায় হয়েছিল। ওঁর লেখা ডায়েরি এখনও আমরা মাঝেসাঝে উল্টেপাল্টে দেখি। সেখান থেকেই জানতে পেরেছিলাম, তখন অফিস শেষে মধ্য কলকাতার অফিসপাড়ায় একজন ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন। প্রতিদিন অফিস শেষে বাবা ও তাঁর সহকর্মী এক ঠোঙা করে ঝালমুড়ি কিনে খেতে-খেতে বাড়ি ফেরার পথ ধরতেন। সঙ্গে তো মুখরোচক আড্ডা চলতই। এ-গলি, সে-গলি শেষে গল্প ফুরিয়ে গেলে সিগারেট ধরাতেন দুই বন্ধু। সুখটান দিয়ে, মুখটুখ মুছে বাস চেপে সোজা বাড়ি।”

ডায়েরির সেই পাতা থেকে আজকের বাস্তবতাকে মিলিয়ে অভিনেতা বলেন, “আজ সেই শহরেই ওঁর ছেলের ছবির পোস্টার প্রতিটি বাসস্টপে! কত বড়-বড় পোস্টারও ছেয়ে আছে হোর্ডিং জুড়ে। ভাবা যায়! উনি কোনওদিনও ভাবতে পেরেছিলেন এরকম হবে? ওঁর কথা ছাড়ুন, আমি কোনওদিনও ভাবতে পেরেছিলাম যে শহরে আমার বাবা একদিন কাজ করতে আসবেন সেই শহরেই আমার অভিনীত ছবির বড়-বড় পোস্টার পড়বে? সময়ের খেলা ছাড়া একে আর কী-ই বা বলবে বলুন...।” বলতে বলতে আবেগে বুজে আসে জনপ্রিয় এই বর্ষীয়ান অভিনেতার গলা।

প্রসঙ্গত, বলিউডে ‘আঁখো দেখি’, ‘কামিয়াব’ বা ‘কড়ক সিং’-এর মতো ছবিতে সঞ্জয় মিশ্রের অভিনয় যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন তিনি পর্দায় থাকা মানেই এক আলাদা ম্যাজিক। এবার ঋত্বিক চক্রবর্তীর মতো জাত অভিনেতার সঙ্গে ওঁর বাবা-ছেলের জুটির রসায়ন দেখতে বাঙালি দর্শক যে সিনেমা হলে ভিড় জমাবেন, তা বলাই বাহুল্য। পৃথা চক্রবর্তীর পরিচালনায় ‘ফেরা’ টলিউডের অন্যতম সেরা মানবিক সম্পর্কের দলিল হতে চলেছে বলেই মনে করছেন চলচ্চিত্র সমালোচকেরা।