সেট জুড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা। চারিদিকে ছড়ানো চিকিৎসা সরঞ্জাম। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন একজন অভিনেত্রী, যার শরীরের অর্ধেক অংশ আগুনে ঝলসে গেছে। সাদা চাদরের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে অগ্নিদগ্ধ দু’খানি পা। ঠিক ৪১ বছর আগে, ১৯৮৫ সালের এক জুলাইয়ের রাতে এভাবেই কলকাতার এক নামজাদা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন টলিউডের তৎকালীন সেনসেশন মহুয়া রায়চৌধুরী। চার দশক পর ঠিক সেই হাড়হিম করা দৃশ্যই নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠল স্টুডিওর সেটে!

টলিউড কাঁপানো অকালপ্রয়াত এই অভিনেত্রীর রহস্যমৃত্যু আজও বাঙালির মনে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। আত্মহত্যা না কি খুন? যে মানুষটা সুযোগ পেলেই হাতা-খুন্তি হাতে রান্নাঘরে ঢুকে যেতেন, তিনি স্রেফ ছেলের দুধ গরম করতে গিয়ে পুড়ে মারা গেলেন? এই সব বিতর্ক আর রহস্যের উত্তর খুঁজতেই আসছে মহুয়া রায়চৌধুরীর বহুল চর্চিত বায়োপিক 'গুনগুন করে মহুয়া'৷ আর সেই সিনেমারই এক চূড়ান্ত ও মর্মান্তিক দৃশ্যের শুটিংয়ের ছবি সম্প্রতি সামনে আসতেই তোলপাড় টলিপাড়া।

সেট থেকে পাওয়া ছবিতে মহুয়ার চরিত্রে দেখা গেছে ছোটপর্দার জনপ্রিয় ‘জগদ্ধাত্রী’ খ্যাত অভিনেত্রী অঙ্কিতা মল্লিককে। তবে চেনা গ্ল্যামারাস অঙ্কিতা নয়, পোড়া চামড়ার বিভীষিকা মাখা এক রূপান্তর ধরা পড়েছে ছবিতে। আর এই অসাধ্য সাধন করেছেন টলিপাড়ার বিখ্যাত রূপটানশিল্পী সোমনাথ কুণ্ডু। তাঁর হাতের নিখুঁত প্রস্থেটিক মেক-আপে অঙ্কিতার অগ্নিদগ্ধ লুক এতটাই বাস্তবসম্মত হয়েছে যে তা দেখে শিউরে উঠছেন সেটের কলাকুশলীরাও।

ছবির শুটিং প্রায় শেষ ভাগে।সূত্রের খবর, এই বায়োপিকটি কোনও শুষ্ক তথ্যচিত্রের মতো হবে না, বরং এখানে ব্যক্তি মহুয়ার তুমুল বিতর্কিত ব্যক্তিগত জীবন এবং অভিনেত্রী মহুয়ার অবিশ্বাস্য প্রতিভাকে সমানভাবে ও ড্রামাটিক উপায়ে ফুটিয়ে তোলা হবে।


‘গুনগুন করে মহুয়া’ ছবিতে কাস্টিংয়ের ক্ষেত্রে এক দারুণ চমক রেখেছেন পরিচালক রাজদীপ ঘোষ এবং প্রযোজক রাণা সরকার। 

মহুয়ার দুই বয়স: প্রয়াত অভিনেত্রীর তরুণী বেলার চরিত্রে অভিনয় করছেন দিব্যাণী মণ্ডল এবং প্রাপ্তবয়স্ক রূপটি ফুটিয়ে তুলছেন অঙ্কিতা মল্লিক।

মহানায়ক উত্তম কুমার: পর্দায় স্বয়ং ‘মহানায়ক’ উত্তমকুমারের জুতোয় পা গলাচ্ছেন অভিনেতা-পরিচালক তথাগত মুখার্জি।

সন্ধ্যা রায়: মহুয়ার আবিষ্কারক এবং তাঁর মেন্টর সন্ধ্যা রায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যাবে ঋদ্ধিমা ঘোষকে।

অন্যান্য চরিত্রে: মহুয়ার বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরীর চরিত্রে লোকনাথ, দিদির চরিত্রে গায়িকা দেবলীনা নন্দী (যাঁর এই ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হচ্ছে) এবং একটি বিশেষ চরিত্রে থাকছেন অর্পণ ঘোষাল।

 

কেন হঠাৎ মহুয়াকে নিয়ে ছবি? এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। ছবির প্রযোজক রাণা সরকার (দাগ ক্রিয়েটিভ মিডিয়া) নিজের তাড়নার কথা স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “কেউ স্বীকার করুন বা না করুন, মহুয়ার জীবন যথেষ্ট বড় মাপের। ততটাই বড় তাঁর অভিনয় প্রতিভা। মানুষ মহুয়াই বা কেমন ছিলেন? বাংলা বিনোদন দুনিয়ায় তাঁর প্রভাব কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। সে সব কথা এই প্রজন্ম জানবে না?’’

চার দশক পেরিয়ে গেলেও যে রহস্যের কিনারা করতে পারেনি পুলিশ প্রশাসন, বড়পর্দায় সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে চলেছে বাঙালি দর্শক। ‘গুনগুন করে মহুয়া’ কি পারবে সেই অভিশপ্ত রাতের ধোঁয়াশা কাটাতে? উত্তর পাওয়া যাবে খুব তাড়াতাড়ি।