বিদেশের মাটিতে একটুকরো বাংলা, বাঙালিয়ানার উদযাপন৷ ওয়েম্বলিতে বাঙালির শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ঐতিহ্যের এক অপূর্ব উদযাপন। নাচ গান নাটক এমনকি খাবারেও বাঙালিয়ানা৷ লন্ডন মহোৎসব ২০২৬ এর তৃতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হল লন্ডনের ওয়েম্বলির ঐতিহ্যবাহী সাত্তাভিস পাটিদার সেন্টারে। দু'দিনব্যাপী এই মহোৎসবে যুক্তরাজ্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার দর্শক, শিল্পী, উদ্যোক্তা, সাহিত্যিক, ক্রীড়াবিদ ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ  অংশগ্রহণ করেছিলেন৷ 

ক্যান্ডিড কমিউনিকেশন ইউকে-র আয়োজনে ২৭ ও ২৮ জুন অনুষ্ঠিত এই সাংস্কৃতিক উৎসব ওয়েম্বলিকে পরিণত করেছিল বাংলা শিল্প, সঙ্গীত, সাহিত্য, নাটক, ফ্যাশন, ব্যবসা, খাদ্যসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক বর্ণময় মিলনমেলায়।

এই উৎসবের উদ্বোধন করেন ব্রেন্টের মেয়র কাউন্সিলর আমের আগা, হ্যারোর মেয়র কাউন্সিলর যোগেশ তেলি, হ্যারোর মেয়র শ্রীমতি নীলা তেলি, যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন সাংসদ বীরেন্দ্র শর্মা, ক্যান্ডিড কমিউনিকেশন ইন্ডিয়া ও ইউকে-র প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক সায়ন্তন দাস অধিকারী এবং ক্যান্ডিড কমিউনিকেশন ইউকে-র পরিচালক নবমিতা দাস অধিকারী। তাঁদের উপস্থিতি লন্ডন মহোৎসব ২০২৬ এর মঞ্চকে ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান এবং ভাব বিনিময়ের অন্যতম সেতু হিসাবে প্রতিষ্ঠা করল৷ 


এবারের উৎসব যেন চাঁদের হাট৷ গানে গানে মঞ্চ মাতিয়ে রেখেছিলেন শিল্পী শ্রাবণী সেন, রূপঙ্কর বাগচী, পৌষালী ব্যানার্জি, সৌমিত্র রায় (ভূমি), ক্যাকটাস-এর সিধু এবং তথাগত সেনগুপ্ত। আর. ডি. বর্মনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তথাগতর পরিবেশনা দর্শকদের বিপুল প্রশংসা পেয়েছে৷ 

নাট্যপর্বও ছিল সমান আকর্ষণীয়। 'প্রথম পার্থ'-এর মাধ্যমে প্রথমবার যুক্তরাজ্যের মঞ্চে একসঙ্গে অভিনয় করেন দুই প্রখ্যাত অভিনেতা কৌশিক সেন ও দেবশঙ্কর হালদার। তাঁদের সঙ্গে অভিনয় করেন অরিন্দম শীল, অঞ্জনা বসু এবং রায়া ভট্টাচার্য। এই নাট্যপ্রযোজনা দেখতে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নাট্যপ্রেমীরা উপস্থিত হন।

বাংলার ফুটবল ঐতিহ্যকেও বিশেষভাবে সম্মান জানানো হয় 'বাংলার ডার্বি' শীর্ষক আলোচনায়। এতে অংশ নেন কিংবদন্তি ফুটবলার প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, মানস ভট্টাচার্য, ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায় এবং চিমা ওকোরি।সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ক্রীড়া সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য। বাংলার ফুটবলের স্মরণীয় মুহূর্তগুলিকে ঘিরে এই আলোচনা ফুটবলপ্রেমী দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে।

এবারের মহোৎসবে বিশেষ আকর্ষণ ছিল 'মাতৃমা'-র গ্র্যান্ড ফিনালে। তুহিনা পাণ্ডে-র পরিকল্পনায় আয়োজিত মায়েদের জন্য এই অনন্য সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ভারত থেকেও প্রতিযোগীরা লন্ডনে আসেন। আন্তর্জাতিক স্তরে এই আয়োজন ব্যাপক সাড়া ফেলে।

মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের ফাঁকে ছিল ভূরিভোজের আয়োজন। আমিনিয়া লন্ডনে পৌঁছে দিয়েছে কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদ৷  পাশাপাশি ট্যানজারিন-এর উদ্যোগে কলকাতা থেকে আসা শেফ সন্দীপ, রোহিত এবং সুজিৎ বিশেষভাবে প্রস্তুত নানা পদ পরিবেশন করেন। হিন্দুস্তান সুইটস-ও তাদের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি দিয়ে খাদ্য উৎসবকে আরও সমৃদ্ধ করে। এছাড়াও ফুডকা খ্যাত ইন্দ্রজিৎ লাহিড়ী এবং আমিনিয়ার কবির আজহার ও আশের আথার-এর অংশগ্রহণে আয়োজিত বিশেষ খাদ্য আলোচনা দর্শকদের মধ্যে খাবার সম্পর্কে দারুণ উৎসাহ জাগিয়ে তোলে৷ 

 
প্রদর্শনী প্রাঙ্গণেও ছিল ভারত ও যুক্তরাজ্যের বহু নামী ব্র্যান্ড এবং উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি। সুতা, বি. এন. ঘণ্টি, প্রিয়ন্তর-সহ একাধিক পরিচিত ও উদীয়মান সংস্থা নিজেদের পণ্য ও উদ্যোগ তুলে ধরে। এর মাধ্যমে বাংলা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিকাশও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।


এই উৎসব এক ছাদের নিচে শিল্পী, উদ্যোক্তা, চিন্তাবিদ, ব্র্যান্ড এবং কমিউনিটির মানুষকে একত্রিত করে বাংলা সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যকে আরও শক্তিশালী করেছে।
এ প্রসঙ্গে ক্যান্ডিড কমিউনিকেশন ইন্ডিয়া ও ইউকে-র প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক সায়ন্তন দাস অধিকারী বলেন, "প্রতি বছর লন্ডন মহোৎসব আমাদের কাছে শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং যেন ঘরে ফেরার অনুভূতি হয়ে ওঠে। হাজার হাজার মানুষকে একসঙ্গে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, সঙ্গীত এবং স্মৃতিকে উদযাপন করতে দেখার অনুভূতি সত্যিই অনন্য। এ বছর যে ভালবাসা ও সমর্থন আমরা পেয়েছি, তা আমাদের আগামী দিনে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করছে।"

ক্যান্ডিড কমিউনিকেশন ইউকে-র পরিচালক নবমিতা দাস অধিকারী বলেন, "এবার শুধু যুক্তরাজ্য থেকেই নয়, নরওয়ে থেকেও বহু দর্শক আমাদের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছেন। এটা প্রমাণ করে লন্ডন মহোৎসব ধীরে ধীরে সমগ্র ইউরোপ জুড়ে বাঙালি সংস্কৃতির এক আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত হচ্ছে। এত দূর থেকে মানুষ আমাদের সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতি উদযাপন করতে আসছেন—এটা আমাদের কাছে অত্যন্ত গর্বের এবং অনুপ্রেরণার বিষয়।"