২০০৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি এমনিতেই এক অদ্ভুত সমাপতনের সাক্ষী ছিল। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষে ম্যাচের স্কোরলাইন ছিল ১-১। কাকতালীয়ভাবে ফ্রান্সের হয়ে পেনাল্টি থেকে প্রথম গোলটি করেছিলেন অধিনায়ক জিনেদিন জিদান এবং ইতালির হয়ে তা শোধ করেছিলেন এই মার্কো মাতেরাৎজি। অর্থাৎ, ম্যাচের সাধারণ সময়ে ফুটবলীয় দক্ষতায় দুজনেই ছিলেন সমানে সমান।কিন্তু ম্যাচের ভাগ্য বদলে যায় এক্সট্রা টাইমের ১১০তম মিনিটে। মাঠের ভেতর বল ছাড়াই ইতালির পেনাল্টি বক্সের সামনে আচমকা কথা কাটাকাটিতে জড়িয়ে পড়েন জিদান ও মাতেরাৎজি। জিদান যখন কিছুটা উপহাসের ভঙ্গিতে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই মাতেরাৎজি পিছন থেকে এমন কিছু ছুড়ে দেন যা জিদানের ফরাসি রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। জিদান সটান ঘুরে দাঁড়িয়ে বাঘের মতো গর্জে উঠে মাতেরাৎজির বুকে নিজের মাথা দিয়ে এক প্রবল ‘ঢুঁসো’ বা হেডবাট মারেন। রেফারির নজর এড়িয়ে গেলেও লাইন্সম্যানের ইশারায় প্রধান রেফারি হোরাসিও এলিজোন্দো জিদানকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন।জিদান মাঠ ছাড়ার পর ফরাসি দল মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং টাইব্রেকারে ইতালি ৫-৩ ব্যবধানে ফ্রান্সকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর বার্লিনের মাঠে ট্রফির পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে লাল কার্ড খাওয়া জিদানের হেঁটে যাওয়ার সেই ছবি আজ ২০২৬ সালেও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক ফ্রেম হিসেবে রয়ে গিয়েছে। আর এই গোটা ঘটনাটি নিজের চোখে দেখেছিলেন জন অ্যাব্রাহাম।
‘অ্যাকশন হিরো’ হলেও জন আব্রাহামের ফুটবলের প্রতি প্রেম সর্বজনবিদিত। তিনি স্রেফ টিভির পর্দায় খেলা দেখা ফুটবল ফ্যান নন; আইসিএল-এ উত্তর-পূর্ব ভারতের ফুটবল ক্লাব ‘নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি’ -এর মালিকও তিনি। স্কুল ও কলেজ জীবনে দাপিয়ে ‘এ’ ডিভিশন ফুটবল খেলেছেন এবং ওঁর তৎকালীন কোচের মতে, জনের মধ্যে দেশের হয়ে খেলার মতোও সম্ভাবনা ছিল! তবে শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা ও কেরিয়ারের চক্করে ফুটবলের বুট জোড়া তুলে রেখে গ্ল্যামার দুনিয়ায় পা রাখতে হয় ওঁকে।
ফুটবল পাগল এই অভিনেতা ওঁর জীবনের অন্যতম সেরা এবং ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ও ঐতিহাসিক এক অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছিলেন তাঁর এক সাক্ষাৎকারে। জন দাবি করেফছিলেন, ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর ফাইনালে যেখানে জিনেদিন জিদান ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জি-কে ঢুঁসো বা হেডবাট মেরে লাল কার্ড দেখেছিলেন, সেই সময় বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন তিনি!
২০০৬ সালের ৯ই জুলাই বার্লিনের সেই রুদ্ধশ্বাস ফাইনালের স্মৃতি রোমন্থন করে জন আব্রাহাম বলেন, “হ্যাঁ, জিনেদিন জিদান যখন মার্কো মাতেরাজ্জিকে ওঁর বুকের ওপর সেই বিখ্যাত ঢুঁসোটি মারেন, আমি তখন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতেই বসেছিলাম। তবে হ্যাঁ, ওটা মোটেও আমার প্রিয় মুহূর্ত ছিল না। একটা বিষয় খেয়াল করবেন, মাঠে যখন এই ধরণের কোনও ফাউল বা মারামারি হয়, তখন গ্যালারির দর্শকদের উত্তেজিত হওয়া থেকে আটকাতে জায়ান্ট স্ক্রিনে ওঁর রিপ্লে দেখানো হয় না। তাই আমিও ওই ঘটনার লাইভ রিপ্লে দেখতে পাইনি।”
জন মাঠের ভেতরের সেই টানটান উত্তেজনার মুহূর্ত বর্ণনা করে আরও যোগ করেন, “আমি হঠাৎই দেখলাম মাতেরাজ্জি মাঠে শুয়ে ব্যথায় ছটফট করছেন। এর পরই দেখলাম ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক বুঁফো উন্মাদের মতো দৌড়ে লাইন্সম্যানের দিকে যাচ্ছেন আর চিৎকার করছেন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো স্টেডিয়ামের দর্শকেরা চিৎকার শুরু করে দিল। ঠিক ওঁর পরেই রেফারি এসে পকেট থেকে লাল কার্ড বের করে জিদানকে মাঠ থেকে বের করে দিলেন।”
জিদানের মতো ফুটবল রাজপুত্রের ওভাবে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার ট্র্যাজেডি মেনে নিতে পারেনি গ্যালারির সিংহভাগ দর্শক। জনের মতে, ওই ঘটনার পর পুরো স্টেডিয়ামের আবহ যেন বদলে গিয়েছিল -“স্টেডিয়ামে তখন ৬৯,০০০-এরও বেশি দর্শক উপস্থিত ছিলেন। জিদান মাঠ ছাড়ার পর ইতালি দলের কোনও খেলোয়াড়ের পায়ে বল গেলেই পুরো স্টেডিয়াম ওঁরদের লক্ষ্য করে ‘বু’ ধ্বনি দিচ্ছিল। সেই কানফাটানো চিৎকারের আওয়াজ এবং উন্মাদনা আমার কান স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ফুটবল ইতিহাসের এমন একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতা কোনওদিন ভোলার নয়,” জানান জন।
জন জানান, ওঁর বাবা ওঁর মনে ফুটবলের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে ইতালির পাওলো রসি-র সেই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দেখার সময় জনের বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। ওঁর বাবা জোর করে ওঁকে খেলা দেখাতেন, আর ওখান থেকেই ফুটবল ওঁর রক্তে মিশে যায়। ১৯৮৬-তে মেক্সিকোর মাঠে মারাদোনার ম্যাজিক থেকে ১৯৯০-এর ইতালি বিশ্বকাপ— জন বিগত চার দশক ধরে ফুটবলের প্রতিটা স্পন্দনকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছেন। আর আজ, ২০২৬ বিশ্বকাপের আসরে দাঁড়িয়েও জনের সেই পুরনো ফুটবল প্রেম যেন একটুও ফিকে হয়নি!















