আসন্ন ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। আর এই বিশেষ দিনটিকে সামনে রেখে বিশ্বভারতী তথা শান্তিনিকেতনে পালিত হল এক অনন্য ও ভিন্নধর্মী সাংস্কৃতিক-পরিবেশ আন্দোলন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নাটক ‘রক্তকরবী’-র শতবর্ষ স্মরণ এবং বিশ্ব পরিবেশ দিবস— এই দুই বিশেষ উপলক্ষ্যকে মিলিয়ে দিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ড্রামস ও পারকাশন বাদক, সুরকার তথা গ্র্যামি জুরি পণ্ডিত প্রদ্যুৎ মুখোপাধ্যায়।

কিংবদন্তি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শান্তিনিকেতনের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন ‘আনন্দধারা’ প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয়েছিল এই ব্যতিক্রমী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির। যেখানে শতবর্ষের স্মারক হিসেবে একটি ‘রক্তকরবী’র চারা রোপণ করা হয়।

সংস্কৃতি ও প্রকৃতির এই মেলবন্ধনে পণ্ডিত প্রদ্যুৎ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ‘মোহর বীথিকা প্রাঙ্গণ’। শান্তিনিকেতনের লাল মাটির বুকে এই রক্তকরবীর চারা রোপণ স্রেফ একটি সাধারণ বৃক্ষরোপণ নয়, বরং এটি এক গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্মরণ। এই মাটি যেমন অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আত্মবলিদানের ও প্রতিবাদের (রক্তকরবী নাটকের মূল ভাবনা), তেমনই এটি সঙ্গীত, শিল্প ও সংস্কৃতির পীঠস্থান।

অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের চিরন্তন প্রকৃতির গান “মরুবিজয়ের কেতন ওড়াও শূন্যে হে প্রবল” পরম শ্রদ্ধায় পরিবেশন করেন শিল্পী প্রিয়ম মুখোপাধ্যায় এবং ঋতপা ভট্টাচার্য। রবীন্দ্রনাথের প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তির এই পুণ্যভূমিতে এবং ‘মোহর’ (কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকনাম)-এর বাড়ির আঙিনায় এমন উদ্যোগে স্বভাবতই অত্যন্ত খুশি শিল্পীর পরিবারের সদস্য ও আশ্রমিকেরা। সমগ্র অনুষ্ঠানটির মূল ভাবনায় ছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সুদীপ্ত চন্দ।

 

শান্তিনিকেতনে এই চারা গাছ রোপণ করতে পেরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পণ্ডিত প্রদ্যুৎ মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “আগামী ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস, আর কাকতালীয়ভাবে ওই দিনটি আমার জন্মদিনও বটে। যে পৃথিবীর মাটিতে আমরা বড় হয়েছি, যে প্রকৃতি আমাদের প্রতিনিয়ত বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিঃশুল্ক অক্সিজেন দিয়ে চলেছে, সেই প্রকৃতিই যদি আজ সুস্থ না থাকে, তবে আমরা আমাদের বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মের কাছে কী রেখে যাবো? পরিবেশকে রক্ষা করা আমাদের পরম কর্তব্য। এর আগে আমি সম্পূর্ণ অব্যবহারযোগ্য বা ফেলে দেওয়া পুরোনো বাদ্যযন্ত্রের  ভেতরে মাটি দিয়ে গাছ লাগিয়েছিলাম, যা দেখতেও সুন্দর হয়েছিল এবং পরিবেশের কাজেও লেগেছিল। আর এবার এই শান্তিনিকেতনের পবিত্র ভূমিতে এসে গাছ লাগাতে পারাটা আমার কাছে একাধারে পরম সম্মানের, গর্বের এবং শ্রদ্ধার।”

অন্যদিকে, মোহর বীথিকা প্রাঙ্গণের পক্ষে প্রিয়ম মুখোপাধ্যায় ও ঋতপা ভট্টাচার্য বলেন, “রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ বাংলা সাহিত্যের তথা নাট্যজগতের একটি মাইলফলক। তার শতবর্ষ পূর্তিতে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আবহে শান্তিনিকেতনের বুকে এই ধরণের একটি উদ্যোগের তাৎপর্য ও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক গভীরতা অনেক বেশি।”

প্রকৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির এই সুমধুর মেলবন্ধন আরও একবার মনে করিয়ে দিল যে, বিশ্বকবির শান্তিনিকেতন আজও পরিবেশ চেতনা ও শিল্পচর্চাকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার ধারা বজায় রেখেছে।