-ঐ নূতনের কেতন ওড়ে তোরা সব জয়ধ্বনি কর!

- আন্দোলনকারী সকল ছাত্রছাত্রীদের আমার প্রাণভরা ভালবাসা, আশীর্বাদ 

- এই নবীনরা আমার শিক্ষক, আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে! 


মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষায় স্বচ্ছতা আনা এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার দুপুর থেকেই তপ্ত হয়ে ওঠে কলকাতার রাজপথ। সিজেপি-র ডাকা এই আন্দোলনে শামিল হয় বাঁধভাঙা ছাত্রছাত্রীর দল। যদিও প্রধানমন্ত্রী ভিডিওবার্তায় কঠোর পদক্ষেপ ও ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের মাধ্যমে শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন, তবুও থামেনি আন্দোলন। সন্ধ্যার ধর্মতলা মোড় যখন বিক্ষোভরত ছাত্রছাত্রী ও পুলিশের বচসায় উত্তপ্ত, ঠিক তখনই এই তরুণ প্রজন্মকে খোলা গলায় সমর্থন জানালেন কবীর সুমনআজকাল ডট ইন-কে কী বললেন তিনি? 


আশি ছুঁইছুঁই বয়সেও যাঁর রক্তে শিহরণ জাগায় তারুণ্যের স্পন্দন, যাঁর কাছে জীবন মানেই ফুরিয়ে না যাওয়া এক অফুরান কৌতূহল—তিনি কবীর সুমন। ‘গানওলা’ মানেই তো একরাশ আবেগ, তারুণ্যের গান  আর প্রথাভাঙা বিপ্লবের উদযাপন। নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে উত্তাল গোটা দেশ। দিল্লির গণ্ডি পেরিয়ে সেই প্রতিবাদের আঁচ এসে লেগেছে কলকাতার রাজপথেও। শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা—শুক্রবারের উত্তাল ছাত্রমিছিল এবং তার জেরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এবার আজকাল ডট ইন-এর মুখোমুখি কবীর সুমন।


আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে প্রবীণ এই শিল্পী বলেন,"ভারতবর্ষের একজন নাগরিক হিসেবে আন্দোলনকারী সকল ছাত্রছাত্রীদের আমার প্রাণভরা ভালবাসা, আশীর্বাদ জানাচ্ছি। দিল্লি, কলকাতা নির্বিশেষে। আমি ভীষণ গর্বিত! ভীষণ গর্বিত। দেখুন, আমি ৭৭ পেরিয়ে ৭৮ ছুঁতে চলেছি। এমন একজন বুড়ো মানুষ যে কারও সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না, বসতে পারে না, হাঁটতে পারে না। সেখানে এই নবীন প্রাণের ধ্বজা উড়তে দেখে তাঁর ভাল না লেগে উপায় আছে?"

কথা বলতে বলতে আর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে উঠলেন সেই চেনা পংক্তি—

"ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর..."

এর পরই আবেগে গলা ধরে আসে তাঁর। বলেন, "কেয়াবাত হ্যায়! এই যে নজরুল ইসলামের গান আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। এটা কাজী নজরুল ইসলামের ভাষার দেশ। এই গান গাইতে গাইতে চোখে জল চলে আসছে... নজরুলের এই গান আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি ঘটতে। এটাই হল গতি!"

সঙ্গে যাঁরা এই গতিকদমকে থামানোর দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাঁদের প্রতি এক ধরণের ঔদাসীন্য ও করুণাই প্রকাশ করেছেন তিনি। সুমনের সাফ কথা, "যাঁরা এদের গতিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, আমি তাঁদের সম্পর্কে চিন্তিত নই। বিন্দুমাত্র নই! ঈশ্বর তাঁদের মঙ্গল করুন।"


সামান্য থেমে কবীর সুমনের গলায় শোনা গেল এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধি। বর্তমান সময়কে এক 'অদ্ভুত ক্রান্তিকাল' হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন,"আমার কী মনে হয় জানেন তো, আমরা একটা অদ্ভুত সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি—যে সময়টা আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে। আবার বলছি, শিক্ষা দিচ্ছে! এই নবীনরা আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে সকলকে। আমার শিক্ষক এরা! আমার কুর্নিশ এদেরকে।"

ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে সমষ্টির কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা কবীর সুমন আবারও প্রমাণ করলেন—তারুণ্যের আগুন নেভে না, আর সেই আগুনকে কুর্নিশ জানাতে বয়সের দূরত্ব কেবলই এক সংখ্যা মাত্র।