টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা ভাস্বর চট্টোপাধ্যায় বরাবরই সোজাসাপটা কথা বলতে ভালবাসেন। সমাজমাধ্যমের পাতায় নিজের ব্যক্তিগত জীবন, টলিউডের ভাল-মন্দ এবং বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে ওঁর মতামত সপাটে ভাগ করে নেন অনুরাগীদের সঙ্গে। সোমবারও তার অন্যথা হল না। নিজের দীর্ঘ অভিনয় জীবনের এক মস্ত বড় আক্ষেপ ও না-বলা সত্যি ফেসবুকের পাতায় উজাড় করে দিলেন অভিনেতা। থিয়েটার, সিনেমা, মেগা সিরিয়াল কিংবা বেতার— অভিনয়ের সব মাধ্যমেই দাপিয়ে কাজ করেছেন ভাস্বর। কিন্তু একটা জায়গায় ওঁর আজও মস্ত বড় খামতি রয়ে গেছে। আর তা হলো বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘যাত্রা’ মাধ্যম।
২০০৫ সাল থেকেই ভাস্বরের কাছে যাত্রায় অভিনয় করার একের পর এক বড় প্রস্তাব আসতে শুরু করে। যাত্রাপাড়ার নামী দলগুলো তাঁকে নিজেদের পালায় প্রধান চরিত্র হিসেবে পাওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিল। সেই সময়ের এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার কথা মনে করে ভাস্বর ওঁর ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “আমার কাছে ২০০৫ থেকে যাত্রার অফার আসে। একবার এমনও হয়েছিল এক বিখ্যাত দলের মালিক ফোন করে বলেছিলেন, ‘আপনি কোথায় আছেন বলুন, আমি টাকা নিয়ে আসছি।’ আমি না বলে দিয়েছি। আমার অনেক সহকর্মী আমাকে বলেছেন তাদের সঙ্গে যাত্রা করতে, আমি তাদেরও না বলে দিয়েছি।”
টাকার থলি নিয়ে প্রযোজকেরা দরজায় কড়া নাড়লেও, ভাস্বর নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। কিন্তু কেন? অভিনেতা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই মাধ্যমটির প্রতি ওঁর অগাধ সম্মান থাকলেও এর পেছনের পরিশ্রম ও ধকল সামলানো ওঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল।
যাত্রা না করার পেছনে দুটি মূল কারণ ব্যাখ্যা করে অভিনেতা বলেন-
প্রথমত: ওঁর মনে হয়েছে এই মাধ্যমটি অত্যন্ত কঠিন এবং জটিল।
দ্বিতীয়ত: রাত জেগে অভিনয় করা ওঁর পক্ষে একেবারে অসম্ভব । তার ওপর দূর-দূরান্তে যাতায়াতের ধকল তো রয়েছেই। যাত্রার মরশুমে শিল্পীদের বডি ক্লক সম্পূর্ণ পাল্টে যায়, যা মেনে চলা ওঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

অশোক কুমার, অনিতেশ ভট্টাচার্য, মহুয়া ভট্টাচার্যের মতো নামী যাত্রা শিল্পীদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করার সুবাদে যাত্রার নেপথ্য কাহিনীর গল্প শুনেছেন ভাস্বর। কীভাবে পালা তৈরি হয়, রিহার্সাল হয় এবং শো-এর মরশুমে কতটা কষ্ট করে হাজার হাজার মানুষের ভালবাসা এই শিল্পীরা কুড়িয়ে নেন, তা খুব ভাল করেই জানেন অভিনেতা। তাই পোস্টে তিনি অকপটে লিখেছেন— “যারা সুনামের সঙ্গে দিনের পর দিন যাত্রা করেন বা করছেন তাদের কুর্নিশ। ”
তবে সব মাধ্যমে সফলতার সাথে কাজ করলেও, এই একটি জায়গায় পা না রাখতে পারার বেদনা ভাস্বরকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায়। পোস্টের শেষে নিজের মনের কোণের সেই গোপন আফসোসের কথা স্বীকার করে অভিনেতা লেখেন— “থিয়েটার, সিনেমা, সিরিয়াল, বেতার সবেতেই অভিনয় করেছি তবে এই মাধ্যমে কাজ করা হল না। এটা অবশ্যই আক্ষেপ।”
টলিউডের এত বড় মাপের একজন অভিনেতা হয়েও যেভাবে ভাস্বর যাত্রা জগতের কঠিন বাস্তবকে সম্মান জানিয়ে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন, তা ওঁর অনুরাগী ও সহকর্মীদের মন ছুঁয়ে গিয়েছে।















