আইন একটা আস্ত গাধা, আর সেই আইনের মারপ্যাঁচে আটকে পড়া সাধারণ মানুষগুলো আসলে এক একটা সার্কাসের ‘বাঁদর’! পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ তাঁর নতুন ড্রামা ফিল্ম ‘বান্দর’-এ এই নির্মম সত্যিটাই দর্শকদের মুখের ওপর ছুঁড়ে দিয়েছেন। সুদীপ শর্মা ও অভিষেক ব্যানার্জির ক্ষুরধার লেখনীতে তৈরি এই ছবি কোনও চেনা ছকের বলিউড সিনেমা নয়, এটি বিচার ব্যবস্থার নামে চলা এক অন্তহীন প্রহসন এবং পুরুষতান্ত্রিক অহংকারের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক ময়নাতদন্ত। ‘অ্যানিম্যাল’ কিংবা ‘আলফা’র সেই চেনা মারকুটে, পেশিবহুল খলনায়কের ইমেজ ঝেড়ে ফেলে এই ছবিতে এক সম্পূর্ণ ‘ভিন্ন’ ববি দেওল -কে আবিষ্কার করল বলিউড। পর্দায় ওঁর এই রূপান্তর স্রেফ প্রশংসনীয় নয়, এককথায় রুদ্ধশ্বাস!
ছবির মূল চরিত্র সমর মেহরা (ববি দেওল)। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই বিনোদন দুনিয়ার চেনা মুখের সুসময় এখন অতীত। পকেটে টান, ইনসিওরেন্সের মেয়াদ শেষ, এমনকি পিঠের যন্ত্রণায় যে অস্ত্রোপচার দরকার, তার টাকাও ওঁর কাছে নেই। কিন্তু ওঁর খাটো হয়ে আসা ভাগ্যের ওপর আসল বিপর্যয় নেমে আসে এক মধ্যরাতে। দুই দুঁদে পুলিশ অফিসার (জিতেন্দ্র জোশি এবং নাগেশ ভোসলে) ওঁর দরজায় কড়া নাড়ে। কারণ? সমরের প্রাক্তন বান্ধবী (স্বপ্না পব্বী) ওঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মতো মারাত্মক অভিযোগ এনেছেন!
কিছু বুঝে ওঠার আগেই সমরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে। সমরের বর্তমান প্রেমিকা খুশি (সাবা আজাদ), বোন সুহানি (সানিয়া মালহোত্রা) এবং তরুণ আইনজীবী নিতিন (ঋদ্ধি সেন) আপ্রাণ চেষ্টা করেও ওঁকে জামিন করাতে না। সমাজ ও মিডিয়া ট্রায়াল ততক্ষণে সমরকে ‘অপরাধী’ তকমা দিয়ে দিয়েছে। ছবির সহ-পরিচালক একজন নারী (সাক্ষী মেহতা লাও) হওয়া সত্ত্বেও, পুরো সিনেমার দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু সমরের ‘পুরুষালি’ দৃষ্টিকোণ থেকেই চালিত হয়েছে, যা ছবিটিকে আরও বিতর্কিত ও আকর্ষণীয় করে তোলে। এবং ববির নাম। ‘সমর’ নামের হিন্দি অর্থ যুদ্ধ। ববি তো যুদ্ধই করছেন সিস্টেম, বিচারব্যবস্থা এবং জেলের মধ্যে।
‘বান্দর’-এর বেশিরভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে একটি জেলখানার অন্দরের স্যাঁতস্যাঁতে, গা গুলানো, ক্লেদাক্ত পরিবেশ। ধর্ষণের আসামী হওয়ায় জেলের কয়েদিদের কাছে সমর একজন ‘অচ্ছুত’। পশুর চেয়েও অধম আচরণ করা হয় ওঁর সাথে। যেখানে ২০ জনের জায়গায় ১০০ জন কয়েদিকে ঠুসে রাখা হয়েছে, সেখানে খাওয়া, ঘুমানো, মলত্যাগ করা থেকে শুরু করে বেঁচে থাকার জন্য ক্ষমতা দখলের যে লড়াই— তা পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ কোনও রুচির মলমলে পরত ছাড়াই অত্যন্ত ‘র’ ও রূঢ়ভাবে ক্যামেরায় বন্দি করেছেন।
এই ছবিতে বিচারাধীন বন্দিদের চরিত্রে একঝাঁক দুর্দান্ত অভিনেতার সমাগম ঘটিয়েছেন অনুরাগ। টিকটিকির লেজের ধোঁয়া খেয়ে নেশা করা দুই বন্দীর চরিত্রে কন্নড় সিনেমার প্রখ্যাত পরিচালক রাজ বি. শেট্টি এবং নটেশ হেগড়ে চমকে দিয়েছেন। জেলের ‘ডন’ লিজোর চরিত্রে মালয়ালি তারকা ইন্দ্রজিৎ সুকুমারন এবং অন্যান্য কয়েদির ভূমিকায় আমির আজিজ ও সুকান্ত গোয়েলের পারফরম্যান্স ছবির অন্যতম সেরা প্রাপ্তি।
অনুরাগ কাশ্যপ ওঁর চেনা ‘বিশৃঙ্খল’ পরিচালনার স্টাইল থেকে বেরিয়ে এসে এখানে অত্যন্ত পরিণত ও সংযত কাজ করেছেন। এ সিনেমা দর্শকের কোনও সস্তা নীতিশিক্ষা দেয় না, কিংবা সমাজকে ভাল-মন্দের সাদা-কালোর ব্র্যাকেটে ফেলে দেয় না। বরং এটি দর্শকের বিবেকের সামনে একটা বড় প্রশ্ন চিহ্ন ঝুলিয়ে দেয়— একজন পুরুষ বা পুরুষ-তারকা হলেই কি সে অবধারিতভাবে অপরাধী? না কি সে কোনও পুরনো শত্রুতার শিকার? সত্যি যেখানে আবছা, সেখানে সমাজমাধ্যমে মানুষজন যেভাবে ‘ডিজিটাল বিচারক এবং জল্লাদ’ সেজে রায় দিয়ে দেয়, সেই সস্তা সংস্কৃতিকে তুলোধোনা করেছে এই ছবি।
তবে অসঙ্গতি, দুর্বলতা কি নেই এ ছবির? ২ ঘণ্টা ২০ মিনিটের বান্দর-এর দ্বিতীয় ভাগে বেশ ঝুলে যায়। এবং খানিক একঘেয়ে। ছবির একাধিক সাবপ্লট দর্শকের ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে। তাতে কেউ যদি বিরক্ত হয় কিংবা হাই তোলেন, তাহলে তাঁকে কিছুতেই দোষ দেওয়া যাবে না। আরও একটু টানটান সম্পাদনা হলে ছবিটি 'ভাল' হতে পারত। আরও আছে। সমরের চারপাশের নারী চরিত্রগুলো, বিশেষ করে ওঁর প্রাক্তন প্রেমিকার মানসিক বিকারগ্রস্ত রূপটি যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা কিছুটা একপেশে, খানিক অবিশ্বাস্য এবং যথেষ্ট সমস্যার মনে হতে পারে। এও মনে হতে পারে, যে কারণে সমরকে ফাঁসানো হল, সেই কারণ আরও পোক্ত হলে জমাটি হতো। চর্চা হতে পারে, ঋদ্ধি সেনের মতো জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা ছোট্ট অথচ বিরাট গুরুত্বপূর্ণ নয় একটি চরিত্রে কেন অভিনয় করলেন, তা নিয়েও। ছবিতে একটিমাত্র গান এবং তা মোটেই মনে রাখার মতো নয়। যদিও গোটা ছবি জুড়ে যে আবহসঙ্গীত চলেছে, তা চলনসই। একটি কথা, স্বীকার করে নেওয়া ভাল, যদি দর্শক 'গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর', 'রমন রাঘব ২.০' কিংবা 'মুক্কাবাজ'-এর ধারালো, চনমনে, ক্ষুরধার অনুরাগকে খুঁজতে 'বান্দর' দেখতে বসেন, তাহলে তাঁরা হতাশ হবেন। তাহলে কি এই ছবিতে অনুরাগের ছোঁয়া নেই? অবশ্যই আছে। মাস্টার্স-ক্রাফ্টের ছোঁয়া এতেও আছে কিন্তু তা খানিক প্যারালাইজড মাস্টার!
‘বান্দর’ আপনাকে আরাম দেবে না, বরং জেলের ভেতরের সেই স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের মনস্তাত্ত্বিক দমবন্ধ পরিবেশটা আপনার মনের মধ্যেও তৈরি করতে বাধ্য করবে। সাধারণ দর্শকদের ক্লিয়ার-কাট এন্ডিং না দিলেও, সিনেমাপ্রেমীরা এই ছবি দেখতেই পারেন । মেলোড্রামা বর্জন করে সমাজের এক জ্বলন্ত বাস্তবকে সপাটে তুলে ধরার জন্য এবং ববি দেওলের অভিনয়ের ‘ম্যাজিক’ দেখতে ‘বান্দর’ আপনার ওয়াচলিস্টে অন্তত থাকা উচিত।















