নয়ের দশকের টেলিভিশনের পর্দা যাঁদের মনে আছে, তাঁরা মারিয়া গোরেত্তি নামটার সঙ্গে ভীষণ পরিচিত। এমটিভি-র পর্দায় যখন একঝাঁক আত্মবিশ্বাসী, চটপটে তরুণী ভারতীয় পপ-কালচারের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছিলেন, মারিয়া ছিলেন তাঁদের একেবারে প্রথম সারিতে। অথচ, জনপ্রিয়তার ঠিক তুঙ্গে থাকা অবস্থায় হঠাৎ করেই একদিন পর্দা থেকে একপ্রকার নিখোঁজ হয়ে গেলেন তিনি। জানা গিয়েছিল, বলিউড অভিনেতা আরশাদ ওয়ার্সির সঙ্গে বিয়ের পর গ্ল্যামার দুনিয়ার সেই ঝলমলে আলো থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে নিলেন।
সম্প্রতি একটি টক শো-তে এসে নিজের জীবনের সেই কঠিন অথচ বাস্তব মোড় নিয়ে অকপটে মুখ খুললেন এই প্রাক্তন ভিজে। মাতৃত্বের জন্য কেরিয়ার বিসর্জন দেওয়া থেকে শুরু করে আরশাদ ওয়ার্সির কেরিয়ারের চরম অন্ধকার দিনগুলোর গল্প—সবকিছুই তিনি ভাগ করে নিলেন কোনও লুকোছাপা ছাড়াই।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেখানে নারীবাদ আর কেরিয়ারের জয়জয়কার, সেখানে মারিয়া গোরেত্তি কোনও রাখঢাক না রেখেই স্বীকার করলেন এক চরম সত্যি। তিনি বলেন, “খুব সততার সঙ্গে একটা কথা বলি—নিজের টাকা নিজে রোজগার করাটা খুব মিস করি আমি। একটা সময় আমি যে পরিমাণ পারিশ্রমিক পেতাম, তা ছিল অভাবনীয়। আমি নিজের জীবনের অন্য একটা পথ বেছে নিয়েছিলাম। তবে এও ঠিক, যখন এমটিভি-তে কাজ করতাম, এত ভালবাসা আর প্রশংসা পেয়েছিলাম যে আমার মন তৃপ্ত হয়ে গিয়েছিল।”
সন্তানদের মানুষ করার জন্য তিনি নিজেই ঘরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু আজ যখন সেই সন্তানরা টিনেজার, তখন মারিয়া হাসতে হাসতে এক অদ্ভুত একাকীত্বের কথা শোনালেন, “আজ যখন ঘরে বসে থাকি আর আমার টিনেজ ছেলে-মেয়ের ঘরের দরজায় নক করি, তখন মাঝেমধ্যে মনে হয়—আমি কি এটার জন্যই কেরিয়ার ছেড়ে ঘরে বসেছিলাম? তবে পরক্ষণেই মনে হয়, না, আমি ওই সুন্দর সময়টা দারুণ উপভোগ করেছি।”
পর্দার মারিয়া গোরেত্তি ছিলেন অসম্ভব সাহসী আর মিশুক। কিন্তু চাকরি ছাড়ার পর নিজের ব্যক্তিত্বের এক অদ্ভুত অন্ধকার দিক আবিষ্কার করলেন তিনি। মারিয়া জানান, ক্যামেরার সামনে যে আত্মবিশ্বাস দেখা যেত, তা আসলে তাঁর কাজের অংশ ছিল। ক্যামেরা বন্ধ হতেই তিনি বুঝতে পারেন, পেশাদার গণ্ডির বাইরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে বা বন্ধু বানাতে তিনি প্রচণ্ড হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি আসলে একজন পুরোদস্তুর অন্তর্মুখী যাকে বলে ইন্ট্রোভার্ট মানুষ!
বলিউড কতটা নির্মম, তা আরশাদ ওয়ার্সির ক্যারিয়ার দিয়ে খুব কাছ থেকে দেখেছেন মারিয়া। গ্ল্যামার দুনিয়ার আসল রূপ বোঝাতে গিয়ে তিনি আরশাদের জন্মদিনের এক চমৎকার উদাহরণ দেন। মারিয়া বলেন, “আমাদের বাড়িতে আরশাদের জন্মদিনে কতগুলো ফুলের তোড়া আসছে, তা দেখে আমরা ওর জনপ্রিয়তার পারদ মাপতাম। কোনও কোনও বছর এত ফুল আসত যে ঘরে পা ফেলার জায়গা থাকত না। আর কোনও কোনও বছর একটা ফুলও আসত না!”
‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’-এর ‘সার্কিট’ হিসেবে আরশাদ তুমুল জনপ্রিয় হলেও, কেরিয়ারে এমন একটা দীর্ঘ সময় গেছে যখন তিনি তাঁর মনের মতো কাজ পাচ্ছিলেন না। মারিয়া তখন আরশাদের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। তিনি আরশাদকে বলেছিলেন, “যে কাজ তোমার মন থেকে সায় দেয় না, তা দয়া করে কোরো না। ওটা তোমার মন ভেঙে দেবে।”
টাকা-পয়সা আর কাজের দিক থেকে সেই বছরগুলো ছিল মারাত্মক কঠিন। কিন্তু মারিয়া গর্ব করে বলেন, “ওই চরম খারাপ দিনগুলোও আরশাদকে কখনও তেতো বা হিংসুটে মানুষে পরিণত করতে পারেনি। ও কারও বিরুদ্ধে কোনও ক্ষোভ পুষে রাখেনি। আরশাদের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমরা একসঙ্গে জীবনের সবচেয়ে কঠিন অন্ধকার সময়টাও দেখেছি। তাই যখন তুমি জানো যে মাটিতে আছাড় খাওয়াটা কতটা বাস্তব, তখন একটু সাফল্যে অহঙ্কার করার কী আছে?”
১৯৯১ সালে একটি কলেজের নাচ প্রতিযোগিতায় বিচারক হয়ে এসেছিলেন আরশাদ ওয়ার্সি। আর মারিয়া ছিলেন সেই প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রতিযোগী। সেই প্রথম দেখা। এরপর প্রেম এবং ১৯৯৬ সালে চার হাত এক হওয়া। আজ তাঁদের সংসারে দুই সন্তান—ছেলে জিক ওয়ার্সি এবং মেয়ে জিন জোই ওয়ার্সি।
মারিয়া গোরেত্তির এই সাক্ষাৎকারটি প্রমাণ করে, গ্ল্যামার দুনিয়ার আলোর নীচে কতটা বাস্তব আর মাটির কাছাকাছি এক জীবন যুদ্ধ লুকিয়ে থাকে। ট্রফি বা লাইমলাইটের চেয়েও দিনশেষে যে সততা এবং পরিবারের পাশে থাকাটাই আসল—তা মারিয়া ও আরশাদের ২৬ বছরের দাম্পত্য আরও একবার মনে করিয়ে দিল।
















