আজকাল ওয়েবডেস্ক: অবসরের পর আর্থিকভাবে স্বচ্ছল জীবনযাপন করতে কত টাকা সঞ্চয় করা উচিত—এই প্রশ্ন প্রায় প্রত্যেক চাকরিজীবী ও বিনিয়োগকারীর মনেই থাকে। অনেকেই বর্তমান মাসিক খরচের ভিত্তিতে একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। কিন্তু আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বর্তমান খরচ হিসাব করলেই হবে না। মূল্যস্ফীতি, অবসরের পরের জীবনযাত্রা, চিকিৎসা ব্যয়, বিনিয়োগের রিটার্ন এবং আয়ু—সবকিছু বিবেচনা করেই রিটায়ারমেন্ট কর্পাস নির্ধারণ করতে হয়।


ধরা যাক, একটি পরিবারের বর্তমান মাসিক খরচ ১ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে ৩০ হাজার টাকা সন্তানের পড়াশোনা ও অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়, যা অবসরের পর আর থাকবে না। প্রথম নজরে মনে হতে পারে, অবসরের পরে মাসে ৬০-৭০ হাজার টাকাই যথেষ্ট হবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়।


বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান-সংক্রান্ত খরচ, অফিসে যাতায়াত, কর্মজীবনের কিছু ব্যয় বা হোম লোনের ইএমআই কমে যেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবিমা, বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, গৃহকর্মীর খরচ এবং অবসর-পরবর্তী জীবনযাপনের অন্যান্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। তাই বর্তমান খরচ থেকে কিছু অংশ বাদ দিয়ে অবসরের প্রয়োজনীয় অর্থ নির্ধারণ করা ঠিক নয়।


যদি কোনও ব্যক্তির বর্তমান বয়স প্রায় ৩৫ বছর হয় এবং তিনি ৬০ বছর বয়সে অবসর নিতে চান, তাহলে আজকের খরচকে ভবিষ্যতের মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করে হিসাব করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের উদাহরণ অনুযায়ী, যদি বর্তমান সময়ে অবসরের জন্য প্রয়োজনীয় মাসিক খরচ ৭০ হাজার টাকা ধরা হয় এবং অবসর পর্যন্ত প্রতি বছর ৬ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি ধরা হয়, তাহলে ২৫ বছর পরে সেই খরচ বেড়ে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা প্রতি মাসে পৌঁছে যাবে। অর্থাৎ, অবসরের সময় বছরে প্রয়োজন হবে প্রায় ৩৬ লক্ষ টাকা।


তবে অবসরের পরেও খরচ স্থির থাকবে না। যদি অবসরের পরে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ৭ শতাংশ বার্ষিক বিনিয়োগ রিটার্ন এবং ৬০ থেকে ৯০ বছর, অর্থাৎ ৩০ বছরের অবসরকাল ধরা হয়, তাহলে অবসরের সময় প্রয়োজনীয় মৌলিক রিটায়ারমেন্ট কর্পাস হবে প্রায় ৮.১০ কোটি টাকা।


তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র এই অঙ্কের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। দীর্ঘায়ু, চিকিৎসার বাড়তি ব্যয়, কর এবং অপ্রত্যাশিত পারিবারিক প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে নিরাপদভাবে অবসর কাটাতে প্রায় ৯ কোটি থেকে ১০.৮ কোটি টাকার কর্পাস গড়ে তোলার লক্ষ্য রাখা ভাল।


এই বিপুল পরিমাণ অর্থ একদিনে তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই যত তাড়াতাড়ি বিনিয়োগ শুরু করা যায়, ততই সুবিধা। লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগই এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে করছেন আর্থিক বিশেষজ্ঞরা।


বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩৫ বছর বয়সী এমন একজন ব্যক্তি, যার মাসিক আয় ১.৫ লক্ষ টাকা এবং যিনি এখনও অবসরকালীন সঞ্চয় শুরু করেননি, তাঁকে নিজের আয়ের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে বরাদ্দ রাখতে হতে পারে। তবে এই শতাংশ সবার ক্ষেত্রে এক নয়। বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা, সম্পদের বণ্টন এবং প্রত্যাশিত রিটার্নের ওপর তা নির্ভর করে।


সবশেষে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, অবসর পরিকল্পনা মানে শুধু প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা করা নয়। আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগের পরিমাণও বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ বিনিয়োগই একটি বড় রিটায়ারমেন্ট কর্পাস তৈরির সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

&t=1s