আজকাল ওয়েবডেস্ক: অক্টোবর মাসে খুচরা মূল্যস্ফীতি বা রিটেল ইনফ্লেশন রেকর্ড সর্বনিম্নে নেমে এসেছে মাত্র ০.২৫%। খাদ্যদ্রব্যের দামে তীব্র পতন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর হ্রাস এই ঐতিহাসিক নিম্নমুখী প্রবণতার মূল কারণ বলে সরকারি তথ্য থেকে জানা গেছে। বুধবার প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এই তথ্য উঠে আসে।


২০২৫ সালের অক্টোবরের ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) অনুযায়ী এই পরিসংখ্যানটি বাজারের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক নিচে এবং ২০১৫ সালে শুরু হওয়া বর্তমান CPI সিরিজ চালুর পর থেকে এটিই সর্বনিম্ন স্তর। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই সিরিজে ২০১২ সালকে ভিত্তি বছর হিসেবে ধরা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসের খুচরা মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান সংশোধন করে ১.৪৪ শতাংশে নামানো হয়েছে, যা পরপর কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতির ধারা স্থিতিশীলভাবে কমে আসার প্রমাণ বহন করছে।


সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “অক্টোবর মাসে সামগ্রিক ইনফ্লেশন এবং খাদ্যদ্রব্যের ইনফ্লেশনের পতন মূলত জিএসটি হ্রাসের পূর্ণ মাসিক প্রভাবের ফলাফল।”


গত সেপ্টেম্বরের শেষদিকে কেন্দ্র সরকার গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স (GST) কমানোর বড় সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে শতাধিক গণভোগ্য পণ্য — যেমন দুগ্ধজাত দ্রব্য, সাবান, টুথপেস্ট, শ্যাম্পু, এবং অন্যান্য পার্সোনাল কেয়ার পণ্য — এর ওপর করের হার হ্রাস করা হয়। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল দেশীয় চাহিদা বৃদ্ধি করা, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে বিশ্বের বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।


খাদ্যদ্রব্যের দামে নজিরবিহীন পতন
খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি অক্টোবরে ৫.০২% হারে হ্রাস পেয়েছে, যা এক বছর আগের তুলনায় বিশাল পতন। সেপ্টেম্বর মাসে সংশোধিত পতনের হার ছিল ২.৩৩%। বিশেষ করে সবজির দাম ২৭.৫৭% কমেছে, যা আগের মাসে ২১.৩৮% হ্রাসের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। টমেটো, পেঁয়াজ, আলু এবং অন্যান্য তাজা সবজির দামে এই উল্লেখযোগ্য পতন ভোক্তা পর্যায়ে স্বস্তি এনে দিয়েছে।
দুধ, ডিম, এবং অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যের দামেও সামান্য হ্রাস দেখা গেছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি এবং সরকারের হস্তক্ষেপমূলক নীতি এই দামের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা রেখেছে।


অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, এই নজিরবিহীন নিম্ন মুদ্রাস্ফীতি গৃহস্থালি বাজেটের ওপর চাপ কমাবে। ফলে পরিবারগুলো আরও বেশি খরচ করতে উৎসাহী হবে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। সরকারও আশা করছে, এই প্রবণতা ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে আরও গতি দেবে।


এছাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর সুদের হার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপও কিছুটা কমতে পারে। কম মুদ্রাস্ফীতির অর্থ হলো, আরবিআই নীতি সুদ স্থিতিশীল রাখতে বা এমনকি সামান্য হ্রাসের কথা বিবেচনা করতে পারে, যাতে বিনিয়োগ এবং শিল্পখাত আরও উৎসাহ পায়।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নিম্নমুখী প্রবণতা কতদিন টিকে থাকবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যের অস্থিরতা এবং আসন্ন উৎসব সিজনে অভ্যন্তরীণ চাহিদার উপর। যদি চাহিদা হঠাৎ বৃদ্ধি পায় বা বিশ্বের জ্বালানি ও খাদ্যমূল্য আবার বৃদ্ধি পায়, তাহলে আগামী মাসগুলোতে ইনফ্লেশন পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।


সবমিলিয়ে, খাদ্যদ্রব্যের দাম হ্রাস, জিএসটি কমানো, এবং স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খলার ফলেই অক্টোবর মাসে খুচরা মূল্যস্ফীতি ঐতিহাসিক নিম্নস্তরে পৌঁছেছে। এই প্রবণতা ভারতীয় ভোক্তাদের স্বস্তি দিলেও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন যে, বিশ্বের বাজারের পরিবর্তন ভবিষ্যতে এই স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।