আজকাল ওয়েবডেস্ক: খাদ্য, বাসস্থান, যাতায়াত এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ার ফলে অনেক পরিবারের জন্যই এখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। যাদের মাসিক আয় প্রায় ১৫,০০০ টাকা, তাদের জন্য সংসার চালানো প্রায়ই একটি নিরন্তর সংগ্রামের মতো মনে হয়। আর অপ্রত্যাশিত কোনও খরচ দ্রুতই ঋণগ্রস্ত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে আর্থিক পরিকল্পনাকারীদের মতে, সীমিত আয়ের মধ্যেও ঋণমুক্ত জীবনযাপন করা সম্ভব, যদি খরচের ওপর সঠিক নিয়ন্ত্রণ রাখা হয় এবং সঞ্চয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জন্য একটি সহজ ও জনপ্রিয় পদ্ধতি হল '৬০-৩০-১০' বাজেট সূত্র, যা আয়কে সুশৃঙ্খলভাবে ভাগ করতে সহায়তা করে।
৬০-৩০-১০ বাজেট কী?
১৫,০০০ টাকা মাসিক বেতনের ক্ষেত্রে, এই সূত্রটি আয়কে তিনটি ভাগে ভাগ করে- ১) অপরিহার্য খরচ, ২) ব্যক্তিগত বা জীবনযাত্রার খরচ এবং ৩) সঞ্চয়।
বেতনের ৬০ শতাংশ বরাদ্দ রাখুন অপরিহার্য খরচের জন্য
আয়ের সবচেয়ে বড় অংশটি (প্রায় ৯,০০০ টাকা) পরিবারের অনিবার্য খরচের জন্য আলাদা করে রাখা উচিত। এর মধ্যে রয়েছে বাড়ি ভাড়া, বাজার, ইউটিলিটি বিল (বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদি), যাতায়াত খরচ, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন।
নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে এই খরচগুলো সীমাবদ্ধ রাখা অত্যন্ত জরুরি। অপরিহার্য খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে আর্থিক বিশেষজ্ঞরা ঘনঘন বাইরে খাওয়া, হুটহাট কেনাকাটা এবং অপ্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশনের মতো অনাবশ্যক খরচ কমানো।
বেতনের ৩০ শতাংশ বরাদ্দ রাখুন ব্যক্তিগত ও জীবনযাত্রার খরচের জন্য
ব্যক্তিগত প্রয়োজন এবং মাঝেমধ্যে শখ পূরণের জন্য প্রায় ৪,৫০০ টাকা আলাদা রাখা যেতে পারে। এই বিভাগের আওতায় পোশাক-আশাক, সপরিবারে বাইরে ঘুরতে যাওয়া, উৎসব-পার্বণের খরচ, মোবাইল রিচার্জ, বিনোদন কিংবা ছোটখাটো চিকিৎসার খরচ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
মূল বিষয়টি হল এই অর্থকে একটি নির্দিষ্ট সীমা হিসেবে গণ্য করা। এর চেয়ে বেশি খরচ করলে পুরো বাজেটের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং মাস শেষ হওয়ার আগেই আর্থিক চাপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রতি মাসে অন্তত ১০ শতাংশ সঞ্চয় করুন
আয় সীমিত হলেও সঞ্চয়ের বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়। এই সূত্র অনুযায়ী, প্রতি মাসে অন্তত ১,৫০০ টাকা আলাদা করে রাখা প্রয়োজন।
এই অর্থ জরুরি তহবিল হিসেবে কোনও সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখা যেতে পারে অথবা ব্যাঙ্ক ও ডাকঘরের 'রিকারিং ডিপোজিট'-এর মতো কম ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। নিয়মিত সঞ্চয় (তা অল্প পরিমাণেই হোক না কেন) জরুরি পরিস্থিতি ও ভবিষ্যতের লক্ষ্য পূরণের জন্য একটি আর্থিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে পারে।
ঋণ এড়াতে দু'টি অভ্যাস
ইএমআই এবং ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হোন: সহজে ঋণ পাওয়ার সুযোগ অপ্রয়োজনীয় খরচে প্ররোচিত করতে পারে। অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য ঋণ নেওয়া বা ক্রেডিট কার্ডের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঋণের বোঝা তৈরি করতে পারে, যা সীমিত আয়ের ক্ষেত্রে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। কোনও ইএমআই সুবিধা নেওয়ার আগে পরিবারের উচিত যাচাই করে দেখা যে, কেনাকাটাটি সত্যিই প্রয়োজনীয় কি না এবং তা সামর্থ্যের মধ্যে আছে কি না।
প্রতিটি খরচের হিসাব রাখুন: দৈনন্দিন খরচের হিসাব রাখলে খরচের এমন সব ধরন বা অভ্যাস বেরিয়ে আসে যা সাধারণত আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। নোটবুক বা বাজেট-সংক্রান্ত অ্যাপ- যে মাধ্যমেই হোক না কেন, খরচের হিসাব রাখাটা অর্থের অপচয় চিহ্নিত করতে এবং ভবিষ্যতে আরও ভাল আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
বেশি আয় জীবনকে অবশ্যই আরামদায়ক করে তুলতে পারে, তবে আর্থিক স্থিতিশীলতা মূলত নির্ভর করে অর্থ কীভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে তার ওপর, কেবল কতটা আয় হচ্ছে তার ওপর নয়। বাজেট মেনে চলা, খরচে নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং নিয়মিত সঞ্চয়ের মতো সুশৃঙ্খল অভ্যাস পরিবারগুলোকে ঋণমুক্ত থাকতে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।
যাঁদের মাসিক আয় ১৫,০০০ টাকা, তাঁদের জন্য '৬০-৩০-১০' নিয়মের মতো একটি সুপরিকল্পিত বাজেট হয়তো সব আর্থিক সমস্যার সমাধান করবে না, তবে এটি একটি স্থিতিশীল ও ঋণমুক্ত জীবনের পথে চলার জন্য একটি কার্যকর দিকনির্দেশনা করতে পারে।















