আজকাল ওয়েবডেস্ক: জিআই বা ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি আদায়ের দৌড়ে গোটা দেশের মধ্যে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করল পশ্চিমবঙ্গ। মেধা, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির মেলবন্ধনে রাজ্যটি এখন জিআই ফাইলিংয়ের ক্ষেত্রে ভারতের মধ্যে তৃতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, রসনাপ্রিয় বাঙালির মুকুটে যুক্ত হয়েছে আরও এক বড় পালক—খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং খাদ্য উপাদান সংক্রান্ত জিআই রেজিস্ট্রেশন তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ আজ সমগ্র দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। 

দার্জিলিং চা দিয়ে ভারতের বুকে জিআই আন্দোলনের যে ইতিহাস এই রাজ্য শুরু করেছিল, আজ তা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেল। এই অভূতপূর্ব সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে রাজ্য সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং জৈবপ্রযুক্তি বিভাগ (DSTBT)। এই দপ্তরের অধীনে থাকা ‘পেটেন্ট ইনফরমেশন সেন্টার’ ও পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কাউন্সিলের নিরলস প্রচেষ্টায় গ্রামীণ স্তরের কারিগর, চাষি এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলোর উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পাচ্ছে। 

বাংলার এই গৌরবময় যাত্রায় শুধু রাজ্য সরকারই নয়, কেন্দ্রীয় স্তরের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রক এবং সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও আধিকারিকদের যৌথ সহযোগিতা এই সাফল্যকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। কেন্দ্রীয় স্তরে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং তাঁর অধীনস্থ মন্ত্রকের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক নিয়ামক সংস্থা এই পুরো আইনি ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়াটিকে সহজ ও গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। রাজ্যের মাননীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং জৈবপ্রযুক্তি মন্ত্রী অধ্যাপক ড. কল্যাণ চক্রবর্তীর দূরদর্শী নেতৃত্বে এই বিভাগটি প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে, যা বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প ও কৃষি পণ্যকে বিশ্বমঞ্চে এক বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করছে।

পাশাপাশি, কৃষিজাত পণ্যের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারে কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের মতো শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বাংলার এই জয়যাত্রাকে অনেকখানি মসৃণ করেছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের এই প্রশাসনিক সমন্বয়ের ফলেই কনকচুর ধানের খই, চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ, জনাইয়ের মনোহরা, বেলিয়াতোড়ের মেছা সন্দেশ কিংবা খাঁটি নলেন গুড়ের মতো বাংলার নিজস্ব স্বাদ ও ঘরানাগুলো আজ সরকারিভাবে নিজেদের ভৌগোলিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। এর ফলে একসঙ্গে রাজ্যের ২৩টি পণ্যের জিআই তকমা জুটল জুন মাসে। একইসঙ্গে রাজ্যে মোট জিআই পণ্যের সংখ্যা এখন ৫৯। 

এই জিআই স্বীকৃতির প্রভাব শুধুমাত্র কিছু আইনি নথিপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর আসল প্রতিফলন ঘটছে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামীণ অর্থনীতিতে। কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল, কোচবিহারের শীতলপাটি, বিষ্ণুপুরের দশাবতার তাশ, শান্তিনিকেতনের বাটিক শিল্প ও একতারা থেকে শুরু করে খাগড়া ও বাঁকুড়ার কাঁসা-পিতলের বাসন—সব ক্ষেত্রেই কারিগররা এখন নিজেদের কাজের প্রকৃত মূল্য ও সম্মান পাচ্ছেন। কোনও  ভুয়ো বা নকল পণ্য যাতে বাংলার এই আদি শিল্পগুলোর নাম ভাঙিয়ে বাজার দখল করতে না পারে, তা নিশ্চিত করছে এই আইনি কবচ। 

এর ফলে একদিকে যেমন ক্রেতাদের মনে পণ্যের বিশুদ্ধতা নিয়ে আস্থা বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনই গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রপ্তানির সুযোগ এবং পর্যটন শিল্পের এক নতুন দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে। নতুন নতুন সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার এই যে ধারাবাহিক প্রয়াস, তা আজ বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সংরক্ষণের পাশাপাশি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক উজ্জ্বল আদর্শ মডেল হয়ে উঠেছে।