আজকাল ওয়েবডেস্ক: মা মনসা বা মা ঝঙ্কেশ্বরী দেবীকে ঘিরে গ্রামবাসীদের বিশ্বাস ও লোকাচারের এক অনন্য নিদর্শন দেখা গেল পূর্ব বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোটের পলসোনা গ্রামে। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য মেনে বৃহস্পতিবার আষাঢ় মাসের কৃষ্ণ প্রতিপদ তিথিতে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী মা ঝঙ্কেশ্বরী পুজো। এই পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, এখানে জ্যান্ত কেউটে বা কোবরা সাপকেই দেবীর রূপে পূজা করা হয়। বিরল এই লোকাচার প্রত্যক্ষ করতে দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ ভিড় জমান।গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, গ্রামের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ানো এই বিষধর সাপ আসলে মা ঝঙ্কেশ্বরীরই রূপ। তাই তাঁরা সাপকে ‘সাপ’ বলে ডাকেন না, তাঁদের কাছে তিনি ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’। স্থানীয়দের দাবি, বাড়ির উঠোন থেকে শুরু করে রান্নাঘর কিংবা শোবার ঘর—বিভিন্ন জায়গায় এই সাপের অবাধ বিচরণ থাকলেও সাধারণত তারা মানুষের ক্ষতি করে না। তবে অসাবধানতাবশত সাপের গায়ে পা পড়লে বা তাকে বিরক্ত করলে দংশনের ঘটনা ঘটেছে বলেও দাবি গ্রামবাসীদের।

গ্রামের প্রবীণদের মুখে প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনিতে যে সাপ লখিন্দরকে দংশন করেছিল, সেই সাপই নাকি এই এলাকায় মা ঝঙ্কেশ্বরী রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। সেই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এই পুজো ও লোকাচার।পুজোর অন্যতম আকর্ষণ সন্ধ্যায় গ্রামের পরিক্রমা। পরিক্রমা শেষে মন্দিরের সামনে মাটির কলস ভাঙার রীতি রয়েছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, সেই ভাঙা কলসের টুকরো বাড়িতে রেখে দিলে বিষধর সাপের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।গ্রামবাসীদের আরও দাবি, অতীতে বহু মানুষ এই সাপের দংশনের শিকার হলেও তাঁদের কারও মৃত্যু হয়নি। সেই বিশ্বাস থেকেই কেউটে সাপের দংশনকেও তাঁরা ‘কামড়’ না বলে ‘মায়ের প্রসাদ’ বলে মনে করেন। এমনকি সাপের খাদ্য ব্যাঙকেও তাঁরা ‘ব্যাঙ’ না বলে ‘নাড়ু’ নামে উল্লেখ করেন। তাঁদের বিশ্বাস, মা ঝঙ্কেশ্বরীর পুজোর সঙ্গে জড়িত প্রতিটি বিষয়েরই রয়েছে বিশেষ পবিত্রতা ও মর্যাদা।

তবে লোকবিশ্বাসের পাশাপাশি রয়েছে সতর্কবার্তাও। সর্পবিশেষজ্ঞদের মতে, কেউটে অত্যন্ত বিষধর সাপ এবং এর দংশন প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই সাপের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং কেউটে সাপে দংশন করলে কোনওরকম সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

পলসোনা ছাড়াও মঙ্গলকোটের মুশারু, ছোটপোষলা ও নিগন এবং ভাতার ব্লকের বড়পোষলা, শিকোত্তর ও মুকুন্দপুর-সহ মোট সাতটি গ্রামে মা ঝঙ্কেশ্বরীর পুজো অনুষ্ঠিত হয়। তবে ঐতিহ্য ও লোকাচারের কারণে পলসোনার পুজো বিশেষভাবে পরিচিত। পুজোকে কেন্দ্র করে মুশারু গ্রামে বসেছে মেলাও। ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস ও উৎসবের আবহে মেতে উঠেছেন এলাকার মানুষ।জ্যান্ত বিষধর কেউটেকে দেবীর রূপে পূজা—এই বিরল লোকাচারকে ঘিরে মঙ্গলকোটের পলসোনা গ্রাম আজও বহন করে চলেছে বাংলার লোকসংস্কৃতি ও গ্রামীণ বিশ্বাসের এক অনন্য ঐতিহ্য।