মিল্টন সেন: ক্যান্সারে হারিয়েছেন বাঁ চোখের দৃষ্টি। অথচ শতবর্ষেও থেমে থাকেননি। মানুষের সেবায় অনড় পান্ডুয়ার ডাক্তার কালীগোপাল মুখোপাধ্যায়। বয়স যে নিছকই একটা সংখ্যা, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন পান্ডুয়ার কালীগোপাল মুখোপাধ্যায়।

গত ৭৬ বছর ধরে তিনি ডাক্তারি করছেন। বর্তমানে তাঁর বয়স ১০০ বছর। ১৯২৭ সালের ৫ই মে বর্ধমানের ছোট বহরকুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কালীগোপাল। ৯৯ পেরিয়ে চলতি বছরে তিনি ১০০ বছরে পা রেখেছেন। বার্ধক্য বা এক চোখের দৃষ্টিহীনতা তাঁকে দমাতে পারেনি। থামেনি তাঁর চিকিৎসা। ডান চোখের দৃষ্টিতেই পান্ডুয়ার প্রত্যন্ত মানুষের সেবা করে চলেছেন তিনি। বয়সের ভারে শরীরের চামড়া গিয়েছে কুচকে। কালো চুলে পাক ধরেছে। কাঁপা কাঁপা গলায় কথা বলেন। সেটাও খুবই আস্তে। এই বয়সে এসেও এখনও তার গলায় সবসময় ঝোলানো স্টেথোস্কোপ। পায়ের সমস্যা থাকায় স্ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটাচলা করেন। বাড়িতে বসেই রোগী দেখেন তিনি। 

পান্ডুয়ার স্টেশন রোডের বিডিও অফিস সংলগ্ন এলাকার বাড়ি ডাক্তার কালীগোপাল মুখোপাধ্যায়ের। যাঁকে মানুষ আজও ভগবান বলেন। তাঁর বাবা পাঁচুগোপাল মুখোপাধ্যায়ও ছিলেন ডাক্তার। তিনি ছিলেন ইংরেজ আমলের গোল্ড মেডেলিস্ট চিকিৎসক। বাবার অনুপ্রেরণাতে গ্রামের দরিদ্র মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তিনি। 

বর্ধমানের স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর উচ্চশিক্ষায় চিকিৎসার জন্য আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে সুযোগ পান। সেখান থেকে এমবিবিএস এবং ডিটিএম অ্যান্ড এইচ ডিগ্রী অর্জন করেন। 

চিকিৎসা জগতে তিনি পা রেখেছিলেন ১৯৫০ সালে। প্রথমে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে হাউস স্টাফ হিসেবে ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আসেন হুগলির পান্ডুয়া জামগ্রামে। কারণ তাঁর বাবার ইচ্ছা ছিল গ্রামের মানুষের সেবা করা। ধীরে ধীরে পান্ডুয়ার মফস্বল এলাকায় বিরাট সুনাম তৈরি করে ফেলেন তিনি। ক্রমাগত গ্রামের প্রত্যন্ত মানুষদের চিকিৎসা প্রদান করে যান। ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ডাক্তার কালী বাবু। প্রথমে ৫ টাকায় রোগী দেখতেন। তিনি বিনা পয়সায় চিকিৎসা করেছেন রোগীদের। ৮ দশক আগে চিকিৎসা জগতে যখন রক্ত পরীক্ষা, ইসিজি, ইউএসজি এই শব্দগুলোর সঙ্গে গ্রামের মানুষরা একেবারেই পরিচিত ছিল না, তখন থেকেই একেবারে মন্ত্রের মতন কাজ করতো কালীগোপালের ওষুধ। 

দিন রাত ২৪ ঘণ্টা তাঁর প্রধান কাজ ছিল রোগীদের সেবা করা। হাত ধরেই বলে দিতেন দুরারোগ্য রোগের ওষুধ। এখনও তাই করে চলেছেন। রোগী দেখেন প্রত্যহ। বয়সের ভারে নানান শারীরিক সমস্যা তাঁর নিজেরই। তবুও একমনে রোগীদের সেবা করে যান। এক চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লেখেন প্রেস্ক্রিপশন। ক্যান্সারের কারণে ২০২৫ সালে অস্ত্রোপচারের ফলে বাদ যায় বাঁদিকের চোখ। তবে তিনি শুধু চিকিৎসা জগতেই খ্যাতি অর্জন করেননি। যাত্রা, নাটক, থিয়েটার সহ নানান সাংস্কৃতিক প্রতিভা রয়েছে তাঁর মধ্যে। একমাত্র ছেলে সৌম্য মুখোপাধ্যায়। 

পুত্রবধূ ও নাতনিকে নিয়েই চলে ডাক্তারবাবুর সংসার। মাঝেমধ্যে বাবাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন ছেলে। এদিন তিনি বলেন, " ডাক্তারি করছি অনেক দিন ধরেই। কত বছর মনে নেই। এখনও রোগীরা আসেন আমার কাছে।"  

আগের মত এখন আর পারেন না তিনি। তাঁর শরীর ভালোই রয়েছে। ক্যান্সারে একটা চোখ বাদ গিয়েছে। আর ঘাড়ে ব্যাথা রয়েছে। কোনদিন পাঁচটা আবার কোনদিন পনেরোটাও রোগী দেখতে হয়। ৭৬ বছর ধরে ডাক্তারি করছেন। ছেলে সৌম্য মুখোপাধ্যায় বলেছেন, " বাবা ১০০ বছরে পা রেখেছে, এখনও রোগীর সেবা করে যান। বারণ করা সত্ত্বেও কারোর কথা শোনেন না। নিজের শরীরে অঙ্গ বাদ গিয়েছে তবুও রোগী দেখেন। পাঁচ টাকা থেকে রোগী দেখতেন আস্তে আস্তে ১০, কুড়ি পঞ্চাশে টাকা হয়। রোগীরা নিজেরাই বাবার ফি'জ বাড়িয়েছেন।" আগে তাঁর বাবার কাছে একজন কম্পাউন্ডার ছিলেন, তিনি চলে যাওয়ার পর এখন তিনি সাহায্য করেন।

পান্ডুয়ার বিজেপির বিধায়ক তুষার মজুমদার বলেছেন, বাল্য বয়সে তিনি নিজেও ডাক্তারবাবুর কাছে চিকিৎসা করিয়েছেন। তাঁর চিকিৎসায় রোগ সেরেছে। তখনকার সময় এত রক্ত পরীক্ষা, থেরাপি এসব ছিল না। রোগীর নাড়ি ধরে ধরেই রোগের লক্ষণ বলে দিতে পারতেন। ১০০ বছর বয়সেও ডাক্তারবাবু চিকিৎসা করে চলেছেন। ভগবান যদি বলা হয় তাহলে এই ডাক্তার। গ্রামীণ চিকিৎসায় এখনও তাঁর অবদান রয়েছে।

ছবি পার্থ রাহা।