আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্য রাজনীতিতে যখন শাসক দল তৃণমূলের অন্দরে নানা টানাপোড়েন এবং ভাঙনের গুঞ্জন, ঠিক সেই আবহেই এ রাজ্যে বিরোধী শূন্য জায়গাটি ভরাট করতে কোমর বাঁধছে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। তৃণমূলের এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের বিকল্প মুখ হয়ে উঠতে সিপিএম ঠিক কী কৌশল নিতে চলেছে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে দলের অন্দরে। এই লক্ষ্যেই সম্প্রতি গত ২৩ ও ২৪ জুন সিপিএমের রাজ্য দপ্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। তবে এখানেই শেষ নয়, আগামী ৩০ এবং ৩১ আগস্ট নদীয়ার কল্যাণীতে একটি বর্ধিত অধিবেশনের ডাক দেওয়া হয়েছে, যেখানে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলের আগামী রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত কাটাছেঁড়া করা হবে। এই বিশেষ অধিবেশনে যোগ দিতে পারেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবিসহ পলিটব্যুরোর একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব।
গত রাজ্য কমিটির বৈঠকে সাম্প্রতিক বিধানসভা ভোটের ফলাফলের একটি গভীর পর্যালোচনা করা হয়েছে। দলের অন্দরমহলের রিপোর্ট বলছে, গত পাঁচ বছর ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক বড় আন্দোলন ও জনসংযোগ কর্মসূচি গড়ে তোলা হলেও, ভোটের বাক্সে তার আশানুরূপ প্রতিফলন দেখা যায়নি। জনসমর্থনের গ্রাফ এখনো সেই পাঁচ শতাংশের আশেপাশেই আটকে রয়েছে। বামেদের ভোট ব্যাংক— বিশেষত বিজেপি কিংবা তৃণমূলের দিকে ঝুঁকে যাওয়া গরিব খেটেখাওয়া মানুষের বড় অংশকে এখনো পুরোপুরি নিজেদের দিকে ফেরানো সম্ভব হয়নি। তবে এই হতাশার আবহেও দুটি ঘটনা আলিমুদ্দিনকে নতুন করে অক্সিজেন জুগিয়েছে।
প্রথমত, দীর্ঘ খরা কাটিয়ে এবার বিধানসভায় খাতা খুলতে পেরেছে সিপিএম এবং দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ডোমকলের বিধায়ক মুস্তাফিজুর রহমান রানা বিধানসভায় পা রেখেছেন। দ্বিতীয়ত, ফলতা উপনির্বাচনে বামেদের দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা দলের নিচুতলার কর্মীদের মনোবল অনেকটাই বাড়িয়েছে। সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, রাজ্য রাজনীতিতে বড় কোনও রদবদল ঘটাতে পারলে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব এবং এর হাত ধরেই সংখ্যালঘু ভোটও আবার বামেদের দিকে ফিরে আসবে। তবে এখনই রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে খুব আগ্রাসীভাবে পথে নামলে হিতে বিপরীত হতে পারে বলে মনে করছেন দলের একাংশ। নতুন সরকারকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আরও কিছুটা সময় দেওয়া উচিত বলেই আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের ধারণা। আর এই রণকৌশল ও আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপরেখা কী হবে, তা নিয়েই আগামী ৩০ আগস্টের অধিবেশনে মূল আলোচনা হবে।
এদিকে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে রাজ্য কমিটির বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রদবদল ও নতুন অন্তর্ভুক্তি করা হয়েছে। কমিটির নতুন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে প্রবীণ কৃষক নেতা মেঘনাথ ভূঁইয়া এবং যুবনেতা ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তীকে। এর পাশাপাশি, ডোমকলে দলকে ‘শূন্য’ থেকে ‘এক’ করে বিধানসভায় পৌঁছে দেওয়া বিধায়ক মুস্তাফিজুর রহমান রানাকে রাজ্য কমিটির আমন্ত্রিত সদস্য করা হয়েছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির রাজ্য সম্পাদিকা মোনালিসা সিনহাকেও নিয়ে আসা হয়েছে রাজ্য কমিটিতে।
দল কেবল সাংগঠনিক বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বেশ কিছু নতুন কর্মসূচির কথাও ঘোষণা করেছে আলিমুদ্দিন। আগামী ১০ আগস্ট শ্রমজীবী মানুষের ওপর আক্রমণ ও বিতর্কিত শ্রম কোড বাতিলের দাবিতে শ্রমিক, কৃষক এবং বস্তিবাসী সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় একটি বিশাল প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন পুরসভাগুলোতে তৃণমূল আশ্রিত কাউন্সিলরদের দলবদলের জেরে যে নাগরিক পরিষেবা থমকে রয়েছে, তা অবিলম্বে চালু করার দাবিতে আন্দোলনের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাকি থাকা এসআইআর-এর কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা এবং রাজ্যে সব ধরনের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি রুখে দেওয়ার ডাক দিয়েছে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট।
















