শ্রেয়সী পাল: একজন শিল্পী, এক টুকরো কাঠ, আর অগাধ ভক্তি। এই তিনের মেলবন্ধনেই আজ মুর্শিদাবাদের শিল্পীর হাতে গড়া কাঠের বিগ্রহ জায়গা পেল বিশ্বদরবারে। মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ-২ ব্লকের তেঘরী গ্রামের বাসিন্দা সুদীপ সরকার ওরফে বাপ্পা প্রভু প্রমাণ করলেন, শিকড় যদি মাটির সঙ্গে জড়ানো থাকে, তাহলে ডালপালা পৌঁছে যেতে পারে আকাশ ছাড়িয়ে। আর মাত্র এক দিন। তারপরই গড়াবে মহাপ্রভুর রথের চাকা। এই উৎসবের আবহে এখন রাত-দিন এক করে কাজ করছেন ২৯ বছর বয়সী বাপ্পা প্রভু। কারণ তাঁর হাতে তৈরি নিম কাঠের জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা এবার শুধু বাংলা বা ভারত নয়, শোভা পাবে নিউ জিল্যান্ডের একটি ইসকন মন্দিরেও।
২০০৯ সাল। তখন থেকেই মহাপ্রভুর সেবায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন বাপ্পা। আবেগে ঘন গলায় তিনি বলেন, "আজ থেকে ১৫ বছর আগে খেলার ছলে শিশুকাঠ দিয়ে বিগ্রহ তৈরি করা শুরু করেছিলাম। ভাবিনি কোনওদিন আমার হাতের তৈরি বিগ্রহ দেশে এমনকি বিদেশেও পূজিত হবে। আমি তো শুধু হাত চালাই, মহাপ্রভুই আমার হাত দিয়ে তাঁর নিজের বিগ্রহ তৈরি করিয়ে নেন।"
ছোটবেলার শখই আজ পেশা, আবার সাধনাও। সমাজ মাধ্যমের দৌলতে এখন দেশে বিদেশে তাঁর পরিচিতি। এ বছর তাঁর কাছে বরাত এসেছে অন্ধ্রপ্রদেশ, ম্যাঙ্গালোর, বেঙ্গালুরু, তেলেঙ্গানা, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা এমনকি বাংলাদেশ থেকেও। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যেই তাঁর হাতের তৈরি বিগ্রহ পোঁছে গিয়েছে নিউজিল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নেপাল, মালয়েশিয়ায়। তিনি বলেন, "ছোটবেলায় যে কাজটা শখ করে শুরু করেছিলাম, আজ তার মাধ্যমেই দেশ-বিদেশের জগন্নাথ ভক্তদের সঙ্গে নিজেকে জুড়তে পেরেছি। মুর্শিদাবাদ জেলার এই শিল্পকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে পেরেছি, এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কী আছে।"
বাপ্পা প্রভুর বিগ্রহের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, প্রতিটি মূর্তি তৈরি হয় এক খণ্ড নিম কাঠ দিয়েই। কোনও জোড়া কাঠ নেই, নেই একটিও পেরেক। মনের মাধুরী মিশিয়ে তিনি গড়েন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে। এই কাজে তাঁর পাশে ছায়ার মতো থাকেন স্ত্রী অঙ্কিতা সরকার। তিনিই বিগ্রহের অঙ্গসজ্জার দায়িত্ব সামলান।
মুর্শিদাবাদের তাঁর ছোট্ট কর্মশালায় বিভিন্ন মাপের বিগ্রহ রয়েছে । ৮ ইঞ্চি উচ্চতার একটি বিগ্রহের দাম প্রায় ৯ হাজার টাকা। আবার ৪৮ ইঞ্চির বড় মাপের বিগ্রহের দাম ১ লক্ষ ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। বাপ্পার কাছে এবারের সবচেয়ে বড় অর্ডার এসেছে বীরচন্দ্রপুরের একটি মন্দির থেকে। ৪ ফুট উচ্চতার জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ। তবে নজরকারাড়া বিগ্রহটি পূজিত হবে নিউ জিল্যান্ডের এক ইসকন মন্দিরে।
প্রসঙ্গত ওড়িশা, বাংলা সহ গোটা ভারতে নিম কাঠের জগন্নাথের চল বহু যুগের। পুরাণ মতে, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের স্বপ্নাদেশে পুরীর সমুদ্রতটে ভেসে এসেছিল দারুব্রহ্ম। সেই নিম কাঠ থেকেই প্রথম তৈরি হয়েছিল জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি। সেই থেকেই নিম কাঠ হিন্দু উপাসনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী নিম গাছ অত্যন্ত পবিত্র। এই কাঠে সহজে পোকা ধরে না, তাই বহু বছর টেকে। প্রতি ১২ বা ১৯ বছর অন্তর পুরীতে "নবকলেবর" উৎসবের সময় পুরনো বিগ্রহ বদলে নতুন নিম কাঠের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করার রীতি আজও চলছে।
তাই বলাই যায়, মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে বাপ্পার হাতের ছোঁয়ায় নিমকাঠে ছেনির টানে ধীরে ধীরে প্রাণ পায় মহাপ্রভু জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। তাঁর হাতের তৈরি এই বিগ্রহ আজ পৌঁছে যাচ্ছে দেশ-বিদেশে। এ শুধু একজন কারিগরের সাফল্য নয়, এটা মুর্শিদাবাদের কুটির শিল্পের জয়।
















