স্নেহাংশু দত্ত
এই টুর্নামেন্টে ৪৮টি দেশ খেলতে এসেছিল, কিন্তু মাঠের বাইরে আমরা ছিলাম ৪৯তম দল। আমাদের দায়িত্ব ছিল মাঠের বাইরে থেকে খেলাগুলো যাতে সুষ্ঠু ভাবে অনুষ্ঠিত হয় সেটা দেখা। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আমাদের ৪৯তম দল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
আমার দায়িত্ব মূলত তিনটে বড় জায়গায় ভাগ করা ছিল। তার মধ্যে ছিল ফ্যান পার্ক অপারেশনস, স্টেডিয়াম এবং মিডিয়া সেন্টার। ফ্যান পার্কে আমাদের লক্ষ্য ছিল বিশ্বমঞ্চে ডালাসের সেরা রূপ তুলে ধরা। সারা পৃথিবী থেকে আসা ফ্যানদের অভ্যর্থনা জানানো, তাদের সাথে গলা মিলিয়ে আনন্দ করা, সেলফি তুলতে সাহায্য করা থেকে শুরু করে ডালাসের সেরা খাবার ও রেস্তোরাঁ ও দর্শনীয় স্থানের দিকনির্দেশনা দেওয়া, সবই করেছি।
পাশাপাশি মিডিয়া সেন্টারে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সাপোর্ট দিয়েছি যাতে তারা বিশ্বজুড়ে টুর্নামেন্টের খবর নির্বিঘ্নে পৌঁছে দিতে পারেন। ডালাস স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের মোট ৯টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মেসি, রোনাল্ডো, হালান্ড, সালাহ, এমবাপে, ইয়ামালদের মতো প্রায় সব সুপারস্টাররাই খেলেছেন।

ডালাসে খেলা পড়েছিল আর্জেন্টিনা, জাপান, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, পর্তুগাল, ফ্রান্স সহ ১৪টি বিশ্বসেরা দলের। গ্যালারি ও টেক্সাসের রাজপথে সমর্থকদের নিজস্ব উদ্যাপন ছিল দেখার মতো। যেমন ডাচ সমর্থকদের আইকনিক ‘অরেঞ্জ বাস’ প্যারেড, আর্জেন্টাইন ভক্তদের পতাকা ও ড্রাম নিয়ে উন্মাদনাময় ‘বান্দেরাসো’ এবং স্পেনের লাল জার্সিতে পুরো শহরের ‘লা রোহা’ আমেজ।
এর সঙ্গে জাপানি সমর্থকদের ম্যাচ শেষে স্টেডিয়াম পরিষ্কারের অনন্য দৃষ্টান্ত আর ইংলিশ ও পর্তুগিজ ফ্যানদের গলার আওয়াজ পুরো ডালাস শহরকে এক প্রাণবন্ত গ্লোবাল কার্নিভালে পরিণত করেছিল। আমি এসবের সাক্ষী থাকতে পারে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করি নিজেকে। স্পেন এবং ফ্রান্সের হাই-ভোল্টেজ সেমিফাইনাল থেকে শুরু করে গ্রুপ পর্বের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই—প্রতিটি ম্যাচেই দর্শক উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্টেডিয়ামে বসে ফুটবল তারকাদের লড়াই দেখার রোমাঞ্চই আলাদা! বিশেষ করে দুটি মুহূর্ত সারা জীবন আমার মনে গাঁথা থাকবে। প্রথমটা পর্তুগাল বনাম স্পেন ম্যাচে পরাজয়ের পর মাঠ থেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। সোজা টানেল ধরে লকার রুমের দিকে হেঁটে চলে গেলেন। তারকাদের ওপর যে কী পরিমাণ মানসিক চাপ থাকে, তা একদম কাছ থেকে দেখেছি।
অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে শেষ মুহূর্তে লিওনেল মেসির সেই অবিশ্বাস্য ম্যাজিক আর আর্জেন্টিনার জয়! মাঠের ভেতর হাজার হাজার মানুষের সেই গর্জন, বাঁধভাঙা উল্লাস আর গায়ে কাঁটা দেওয়া আবেগ। টিভি পর্দায় দেখা আর স্টেডিয়ামে বসে তা অনুভব করার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। ভাল লাগত আর্জেন্টিনা আবার জিতলে, মেসি কাপ পেলে। কিন্তু স্পেন যোগ্য। পুরো টুর্নামেন্ট দারুণ খেললো। আমি স্পেনের সেলিব্রেশন একদম সামনে থেকে দেখেছি।

আমি সারা জীবন মোটামুটি বাঁধাধরা এবং গতানুগতিক ছকেই হেঁটেছি। আইটি দৈনন্দিন কাজ, কোডিং আর রেগুলার অপারেশনের ভেতরেই দিনগুলো বন্দি ছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের ভলান্টিয়ার হওয়া আমার জীবন এবং মানসিকতায় একটা বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে! পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কত শত অচেনা মানুষের সাথে কথা বললাম, একসাথে হাসলাম, কাজ করলাম। যাদের অনেকের নামও আমি জানি না এবং হয়তো জীবনে আর কখনও দেখাও হবে না।
তবে এই অসাধারণ সফরের শেষটা ছিল একদম রূপকথার মতো। ডালাস স্টেডিয়ামে ফিফা বিশ্বকাপের ভলান্টিয়ারদের জন্য বিশেষ ‘Party on the Pitch’ থ্যাঙ্ক ইউ ইভেন্টে আমন্ত্রিত ছিলাম। ঠিক দু’দিন আগেও যেখানে কিলিয়ান এমবাপে কিংবা লামিন ইয়ামালের মতো বিশ্বসেরা তারকারা ঝড় তুলেছেন, ঠিক সেই পিচে দাঁড়িয়ে বিশ্বের অন্যতম বড় ডিসপ্লে স্ক্রিনে খেলা দেখা। ডালাস প্রমাণ করে দিয়েছে তারা বিশ্বকাপের জন্য অন্যতম সেরা ভেন্যু। ফিফা প্রেসিডেন্ট নিজের মুখে সে কথা বলেছেন।
ডালাসের মাঠ থেকে অর্জিত এই অভিজ্ঞতা আগামী দিনে ভারতের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও স্পোর্টস ট্যুরিজমের বিকাশে কাজে লাগাতে পারলে একজন ভারতীয় হিসেবে দারুণ লাগবে। ভারত যখন বড় আন্তর্জাতিক স্পোর্টস ইভেন্ট ও গ্লোবাল সামিট আয়োজনের দিকে এগোচ্ছে, তখন ডালাসের হোস্ট সিটি মডেল থেকে তিনটি মূল শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।

‘আতিথেয়তা’-কে পরিকাঠামোর রূপ দেওয়া: ভারতে আমাদের ‘অতিথি দেব ভব’ সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু ডালাসের মতো সুনির্দিষ্ট ‘সিটি ওরিয়েন্টেশন’, সহজ রোড-ম্যাপ ও স্পেশাল ভলান্টিয়ার ট্রেনিং যুক্ত করতে পারলে আন্তর্জাতিক অতিথিদের অভিজ্ঞতা অনেক উন্নত হবে।
Decentralized Fan Zones: স্টেডিয়ামের টিকিট সবার কাছে থাকে না। কিন্তু ডালাসের মতো শহরজুড়ে সুসংগঠিত ও নিরাপদ ফ্যান পার্ক তৈরি করলে পুরো শহর জুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হয় এবং স্থানীয় অর্থনীতিও লাভবান হয়।
সুসংগঠিত ব্যাক অফিস এবং মিডিয়া সাপোর্ট: মিডিয়া সেন্টার ও লজিস্টিকস যত নিখুঁত হবে, ইভেন্টের গ্লোবাল কভারেজ ততটাই ইতিবাচক ও সুদূরপ্রসারী হবে।
মেগা-ইভেন্ট চলাকালীন ডালাসে প্রায় ৪০০–৫০০ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ কোটি টাকা) অর্থনৈতিক লেনদেন ঘটেছিল, যেখানে হোটেল বুকিং ১৫০%-২০০% বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় রেস্তোরাঁ ও ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায় ৩-৪ গুণ বিক্রি বাড়ে। ছোটখাটো এয়ারবিএনবি থেকে শুরু করে ফাইভ-স্টার হোটেলগুলো কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। ডালাসের স্থানীয় রেস্তোরাঁ, কফি শপ, রাইড-শেয়ারিং এবং খুচরো ব্যবসাগুলোর দৈনিক বিক্রি সাধারণ সময়ের তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল।
















