পর্তুগাল - ২ (রোনাল্ডো-পেনাল্টি, রামোস)
ক্রোয়েশিয়া - ১ (পেরিসিচ)
আজকাল ওয়েবডেস্ক: নাটকীয় ম্যাচ। অফসাইডের জন্য বাতিল ক্রোয়েশিয়ার শেষ মিনিটের গোল। খেলা শেষ হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগে সমতা ফেরায় ক্রোটরা। কিন্তু অফসাইডের জন্য গোল বাতিল হয়ে যায়। মিনিটের মধ্যে মডরিচদের উচ্ছ্বাস বদলে যায় নিস্তব্ধতায়। ১০ মিনিট অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়। কিন্তু সেটা গড়ায় প্রায় ১৯ মিনিটে। ম্যাচের ৯০+১৩ মিনিটে ২-২ করেন গাভারদিওল। দেখে মনে হয়েছিল পর্তুগালের রুবেন নেভেসের গায়ে লেগে বল গোলে ঢুকেছে। কিন্তু পাসালিচকে অফসাইড দেওয়া হয়। অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। মিনিটের মধ্যে বদলে যায় দুই শিবিরের ছবি। অবশেষে বিশ্বকাপে টিকে গেলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। বিশ্বমঞ্চকে বিদায় জানালেন লুকা মডরিচ। এক মহাতারকার প্রস্থান দেখল বিশ্বফুটবল। ট্রাজিক হিরো বললে খুব ভুল হবে না।
ম্যাচে দশ মিনিটের স্টপেজ টাইম। একট্রা টাইমে গড়ানো প্রায় নিশ্চিত। এমন সময় পরিত্রতার ভূমিকায় গনসালো রামোস। ম্যাচের ৯০+৪ মিনিটে লিওর ক্রস থেকে হেডে গোল সুপার সাবের। টরেন্টোয় ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোয় পর্তুগাল। সোমবার স্পেনের মুখোমুখি হবেন রোনাল্ডোরা। বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায় লুকা মডরিচের। নব্বই মিনিটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর পর্তুগালের পক্ষে স্কোর ২-১। এক গোলে পিছিয়ে থেকে দুর্দান্ত কামব্যাক রবার্তো মার্টিনেজের দলের। প্রথমার্ধ পর্তুগালের। দ্বিতীয়ার্ধ ৫০-৫০। তবে তারমধ্যে দাপট বেশি ছিল ক্রোয়েশিয়ার। প্রথমার্ধের শেষে ম্যাচটাকে রোনাল্ডোদের পক্ষে একপেশে বলা গেলেও, নব্বই মিনিটের শেষে কখনওই সেটা বলা যাবে না। দ্বিতীয়ার্ধে আগ্রাসন ফেরে ক্রোটদের। একইসঙ্গে ফেরে ম্যাচে। বিরতির পর থেকে আক্রমণাত্মক ফুটবলে পর্তুগালকে ব্যাকসিটে ঠেলে দেয় ক্রোয়েশিয়া। তবে শেষ হাসি হাসেন রোনাল্ডোরা। নব্বই মিনিটে তিনটে গোল। চারটে গোল বাতিল। তিনটে ক্রোয়েশিয়ার, একটা পর্তুগালের। সবগুলোই অফসাইডের জন্য। বিশ্বকাপে যত দিন যাচ্ছে, VAR নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।
এদিন ম্যাচের শুরুতে দুই দলের জাতীয় সঙ্গীতের পর টরেন্টোর স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে ভেসে ওঠে দিয়েগো জোটার ছবি। প্রয়াত পর্তুগালের ফুটবলারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। চোখ ছলছল করে ওঠে রোনাল্ডোর। ম্যাচ শেষে জোটাকে এই জয় উৎসর্গ করে পর্তুগাল। দুই দলই ৪-২-৩-১ ফরমেশনে দল সাজায়। ম্যাচের শুরুর থেকেই আগ্রাসী ফুটবল পর্তুগালের। প্রথম সাত মিনিটে চারটে অ্যাটাক। কিছুটা ব্যাকফুটে থেকেই শুরু করে ক্রোয়েশিয়া। ম্যাচের ৪ মিনিটে প্রথম সুযোগ পর্তুগালের। বাঁ দিক থেকে লিওর পাস ধরে ব্রুনো ফার্নান্দেজের শট প্রথমে ব্লক করা হয়। জটলার মধ্যে ফিরতি শট বাঁচিয়ে দেন ডিফেন্ডার। তার মিনিট পাঁচেক পর আবার সুযোগ। এবার রোনাল্ডোকে লক্ষ্য করে ডানদিক থেকে বিপজ্জনক ক্রস তোলেন নেটো। মাথা ছোঁয়াতে পারেননি রোনাল্ডো। পর্তুগাল সাদা সবুজ জার্সিতে খেললেও, স্টেডিয়ামের গ্যালারির রং ছিল লাল। শুরুটা দাপটের সঙ্গে করে রবার্তো মার্টিনেজের দল। কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাড়ম্যাড়ে ফুটবলের পর এদিন শুরু থেকেই ফোর্থ গিয়ারে ছিল পর্তুগাল। কোনও সময় নষ্ট করেনি।
আগাগোড়াই আক্রমণাত্মক ফুটবল পর্তুগালের। ম্যাচের ৩০ মিনিটে আবার সুযোগ। ডানদিক থেকে বক্সে বল রাখেন নেটো। কিন্তু পৌঁছতে পারেননি রোনাল্ডো। তিন মিনিটের মধ্যে গোল পেতে পারত পর্তুগাল। ব্রুনোর শট বাঁচান ক্রোয়েশিয়া গোলকিপার লিভাকোভিচ। সিংহভাগ বলের দখল ছিল পর্তুগালের। প্রথমার্ধে গোনাগুনতিবার বল পায় ক্রোটরা। ম্যাচটিকে আরও আকর্ষণীয় করেছিল দুই চল্লিশোর্ধ্ব তারকার দ্বৈরথ। কিন্তু প্রথম ৪৫ মিনিটে ম্লান দুই মহাতারকা। দলকে সাহায্য করতে পারেননি লুকা মডরিচ। বল পায়ে দেখা যায়নি রোনাল্ডোকেও। মূলত উইং দিয়ে আক্রমণে উঠছিল পর্তুগাল। দুই প্রান্তে সক্রিয় নেটো এবং লিও। অন্যদিকে পুরোপুরি রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে ক্রোয়েশিয়া। নিজেদের বক্স ছেড়ে বেরোতেই পারেনি। তবে রক্ষণ সংগঠনের প্রশংসা করতে হবে। মাঝমাঠে ব্রুনোদের খেলা তৈরি করার জায়গা দেয়নি ক্রোয়েশিয়া। তাসত্ত্বেও প্রথমার্ধে গোল লক্ষ্য করে ৯টি শট নেয় পর্তুগাল। সেখানে মাত্র একটি আধা সুযোগ ক্রোয়েশিয়ার। প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্যভাবে।
দ্বিতীয়ার্ধে যত কাণ্ড। টানটান উত্তেজনা। মোট সাত গোল। তারমধ্যে চারটে বাতিল। ম্যাচের ৪৭ মিনিটে ক্রোয়েশিয়ার প্রথম সুযোগ। বক্সের মধ্যে লুজ বল পেয়ে গোল লক্ষ্য করে শট নেন কোভাসিচ। কিন্তু সাইড নেটে লাগে। ম্যাচে প্রথমবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন পর্তুগালের গোলকিপার। ম্যাচের গতির বিরুদ্ধে গিয়ে ৫৩ মিনিটে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। ডানদিক থেকে স্ট্যানিসিচের ক্রস বাঁ পায়ে রিসিভ করে বাঁ পায়ের শটে গোল পেরিসিচের। বিশ্বকাপে তাঁর সপ্তম গোল। পেরিয়ে যান ক্রোয়েশিয়ার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা দাভের সুকেরকে। ক্রোয়েশিয়ার গোল লক্ষ্য করে প্রথম শটেই গোল। তার দু'মিনিট পর মাতানোভিচের শটে ব্যবধান বাড়তে পারত। কিন্তু অফসাইডের জন্য বাতিল হয়ে যায় ক্রোয়েশিয়ার গোল। ম্যাচের ৫৮ মিনিটে সমতা ফেরানোর সুযোগ পেয়েছিল পর্তুগাল। কিন্তু লিওর শট ক্রসপিসে লাগে।
পিছিয়ে পড়ার পর খেলায় ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালায় পর্তুগাল। ম্যাচের ৬১ মিনিটে নেটোর ক্রস থেকে আলতো লবে বল গোলে রাখেন রোনাল্ডো। কিন্তু অফসাইডের জন্য গোল বাতিল হয়ে যায়। VAR এ খতিয়ে দেখার পরও অফসাইডের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। অবশ্য সমতা ফেরাতে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি পর্তুগালকে। ম্যাচের ৬৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। টরেন্টোতে ফেরে সিউ সেলিব্রেশন। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রথম গোল পর্তুগিজ তারকার। ম্যাচের ৭৫ মিনিটে ক্রোয়েশিয়ার জোড়া সুযোগ। দু'বারই বাঁচান কোস্টা। কোভাসিচের শট পোস্টে লাগে। ফিরতি বলে তাঁরই ভলি বাঁচিয়ে দেন পর্তুগালের গোলকিপার। তার দু'মিনিটের মধ্যে আবার সুযোগ ক্রোয়েশিয়ার। মাতানোভিচের শট আবার বাঁচান কোস্টা।
দ্বিতীয়ার্ধে পর্তুগালকে চাপে ফেলে দেয় ক্রোটরা। ম্যাচের ৮০ মিনিটে পেরিসিচের পাস থেকে গোল করেন সুচিচ। কিন্তু অফসাইডের জন্য বাতিল হয়ে যায়। ম্যাচের ৮১ মিনিটে সবাইকে অবাক করার মতো সিদ্ধান্ত রবার্তো মার্টিনেজের। রোনাল্ডোকে তুলে নেন পর্তুগালের কোচ। বিশ্বাস করতে পারেননি সিআরসেভেন। একইসঙ্গে চোখেমুখে ফুটে ওঠে হতাশা এবং বিরক্তি। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচের ১০ মিনিট বাকি থাকতে রোনাল্ডোকে তুলে নেওয়া সাহসী সিদ্ধান্ত। পেনাল্টি থেকে তাঁর করা গোলেই সমতা ফেরায় পর্তুগাল। কিন্তু মার্টিনেজের সিদ্ধান্ত বুমেরাং হয়ে ফেরেনি। তুলে নেওয়ার পর বেঞ্চে মুখ গম্ভীর করে বসে থাকলেও, রুদ্ধশ্বাস জয়ের পর মাঠে নেমে সতীর্থদের সঙ্গে সেলিব্রেট করেন রোনাল্ডো। নাটকীয় ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর লুকা মডরিচের কাছে গিয়ে সান্ত্বনাও দেন। এক মহাতারকার আরেক মহাতারকাকে কুর্নিশ। রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর মধুরেণ সমাপয়েৎ।















